
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : শ্রীলঙ্কার পর্যটন খাত ২০২৫ সালে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। বছরের নভেম্বর মাসের শুরুতেই দেশটি ১,৯২৩,৫০২ জন আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগমন রেকর্ড করেছে, যা মহামারির পর দেশটির পর্যটন শিল্পে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
নভেম্বরের প্রথম পাঁচ দিনেই ৩২,৮১৫ জন দর্শনার্থী প্রবেশ করেছেন, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ৬,০০০ জনের বেশি পর্যটক দেশটিতে আসছেন। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে, নভেম্বর মাস শেষ হওয়ার আগেই শ্রীলঙ্কা ২০২৪ সালের মোট পর্যটক সংখ্যা—২০,৫৩,৪৬৫ জন—ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
পুনরুত্থানের প্রতিচ্ছবি
কয়েক বছর আগেও অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটন খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু গত দুই বছরে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আতিথেয়তা পুনরায় আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের নজর কেড়েছে।
প্রধান উৎস বাজার
২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কার পর্যটনে ভারতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৪৩১,২৩৫ জন ভারতীয় পর্যটক দেশটিতে ভ্রমণ করেছেন। ভৌগোলিক নৈকট্য, সাশ্রয়ী ভ্রমণ ব্যয় এবং সাংস্কৃতিক মিলের কারণে ভারত থেকে পর্যটক প্রবাহ ক্রমবর্ধমান।
এর পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, রাশিয়ান ফেডারেশন, জার্মানি ও চীন থেকেও ১,০০,০০০-এর বেশি পর্যটক আগমন ঘটেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাশিয়া ও চীনের পর্যটকদের মধ্যে শ্রীলঙ্কার সমুদ্র সৈকত, সাফারি পার্ক ও ঐতিহাসিক স্থাপনার জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মৌসুমের সুযোগ
নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়টিই শ্রীলঙ্কার পর্যটনের পিক সিজন। এ সময়ে দেশের দক্ষিণ ও পশ্চিম উপকূলে আবহাওয়া শুষ্ক ও মনোরম থাকে, যা সৈকতপ্রেমী ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। বর্তমানে কলম্বো, গলে, নেগোম্বো ও বেনটোটা অঞ্চলে হোটেল বুকিং উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপ ও এশিয়ার ঠান্ডা অঞ্চলের মানুষ শ্রীলঙ্কাকে ‘উষ্ণ অবকাশ গন্তব্য’ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। পাশাপাশি, এয়ারলাইন সংযোগ ও ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় পর্যটকদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
সরকারের পদক্ষেপ
শ্রীলঙ্কা সরকার পর্যটন খাতকে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে দেখছে। ২০২৫ সালের বাজেটে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রামীণ পর্যটন প্রচার ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, নতুন ক্রুজ টার্মিনাল স্থাপন এবং হেরিটেজ সাইট সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে।
দেশটির পর্যটন মন্ত্রী বলেছেন, “আমরা শুধু সংখ্যার দিকে নয়, গুণগত অভিজ্ঞতার দিকেও মনোযোগ দিচ্ছি। শ্রীলঙ্কাকে আমরা এশিয়ার অন্যতম প্রিমিয়াম ভ্রমণ গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার যদি বজায় থাকে, তবে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ শ্রীলঙ্কা ২৫ লাখ পর্যটক আগমনের লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে। এতে দেশের জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ও ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের এক বাস্তব উদাহরণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অতীত পেরিয়ে এখন দেশটি আবারও বিশ্ব মানচিত্রে এক আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে।
এক কথায়, শ্রীলঙ্কা প্রমাণ করছে—অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মাঝেও যদি পরিকল্পনা, প্রয়াস ও আত্মবিশ্বাস থাকে, তবে পুনরুত্থান অসম্ভব নয়।




One Comment
https://shorturl.fm/daVmk