২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার যুবসমাজের ‘ভ্রমণ’ কি শুধুই ক্যাফে-রেস্তোরাঁয় আটকে? কংক্রিটের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে প্রকৃত ভ্রমণের পথ

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : ঢাকা শহরের জীবনযাত্রায় এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেখানে একসময় ভ্রমণ মানে ছিল দূরের পাহাড়, নদী বা ঐতিহাসিক স্থানে যাওয়া, সেখানে আজকের যুবক-যুবতীদের কাছে ‘আউটিং’ বা ভ্রমণের প্রধান গন্তব্য হয়ে উঠেছে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি বা উত্তরার ক্যাফে ও রেস্তোরাঁগুলো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এসব জায়গায় যুবসমাজের ভিড় দেখলে মনে হয়, শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে আটকে পড়া মানুষেরা আর বাইরে বেরোতে চায় না। কিন্তু এই অভ্যাস কি সত্যিই স্বাস্থ্যকর? এ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, ট্রাফিক জ্যাম, সময়ের অভাব, খরচের চাপ এবং সচেতনতার অভাবে ঢাকাবাসীরা প্রকৃত ভ্রমণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। অথচ ঢাকার চারপাশে রয়েছে অসংখ্য সাশ্রয়ী ও আকর্ষক দিনভর ভ্রমণের স্থান, যা তাদের জীবনকে বদলে দিতে পারে।

ঢাকার ক্যাফে সংস্কৃতির উত্থান একদিকে ইতিবাচক। বইয়ের ক্যাফে, আর্ট গ্যালারি মিশ্রিত রেস্তোরাঁ বা সবুজায়নযুক্ত আউটডোর স্পেসগুলো যুবকদের সামাজিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার যুবসমাজের অবসর সময়ের বড় অংশ কাটে এসব জায়গায় আড্ডা, কফি ও খাবার নিয়ে। কিন্তু এর পাশাপাশি একটা বড় সমস্যাও তৈরি হয়েছে। শহরের যানজট এতটাই ভয়াবহ যে, গড় গতিবেগ মাত্র ৬.৪ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জ্যামের কারণে ঢাকার অর্থনীতির ক্ষতি প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা। ফলে মানুষেরা দূরের ভ্রমণের কথা ভাবতেই ভয় পান। একজন ঢাকাবাসী যুবক বলেন, “ক্যাফেতে গেলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছে যাই, খরচও কম। কিন্তু সোনারগাঁও বা ভাওয়ালে যেতে চাইলে পুরো দিন নষ্ট হয়ে যায় জ্যামে।” এছাড়া দ্রুত খাবারের সংস্কৃতি, সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব এবং কাজের চাপ যুবকদের ঘরের কাছেই আটকে রাখছে। ফলে শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। বসে থাকা জীবনযাপন, ফাস্টফুড এবং সীমিত সামাজিক অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে একঘেয়েমি বাড়াচ্ছে।

অথচ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনের সম্ভাবনা বিশাল। পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশের পর্যটন খাতের ৯০ শতাংশের বেশি আয় আসে দেশীয় পর্যটকদের কাছ থেকে। প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি মানুষ দেশের ভেতরে ভ্রমণ করেন। কিন্তু ঢাকার বাসিন্দাদের মধ্যে এই সংখ্যা তুলনামূলক কম। কারণ? অবকাঠামোগত সমস্যা এবং সচেতনতার অভাব। তবে সাম্প্রতিককালে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক যুবগোষ্ঠী এখন দিনভর ট্যুর বা উইকেন্ড গেটওয়ের দিকে ঝুঁকছেন। ট্যুর অপারেটররা জানান, ঢাকা থেকে সাশ্রয়ী দিনভর ভ্রমণের চাহিদা বাড়ছে। এখন প্রশ্ন হলো, ক্যাফে-রেস্তোরাঁর বাইরে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

প্রথমত, ঢাকার আশেপাশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে গন্তব্য করা যায়। সোনারগাঁও ও পানাম নগরী এর অন্যতম উদাহরণ। ঢাকা থেকে মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টার দূরত্বে এই প্রাচীন রাজধানীতে রয়েছে লোকশিল্প জাদুঘর, পুরনো ইমারত এবং সবুজ প্রকৃতি। প্রবেশমূল্য মাত্র ২০-৫০ টাকা। বাস বা প্রাইভেট কারে গেলে খরচ ৫০০-১০০০ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সেখানে ঘুরলে শুধু ইতিহাস জানা যায় না, মানসিক প্রশান্তিও মেলে। একইভাবে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান গাজীপুরে অবস্থিত। ঢাকা থেকে এক ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। সেখানে জঙ্গলের মধ্যে হাঁটা, পিকনিক বা বন্যপ্রাণী দেখার সুযোগ রয়েছে। বাস ভাড়া মাত্র ১০০-২০০ টাকা, আর দিনভর খরচ ১৫০০ টাকার নিচে।

আরেকটি জনপ্রিয় গন্তব্য বালিয়াটি জমিদারবাড়ি, মানিকগঞ্জে। কলোনিয়াল আমলের স্থাপত্য, বড় বাগান এবং নদীর ধারে অবস্থিত এই স্থানটি ইনস্টাগ্রাম-যোগ্য ছবির জন্য আদর্শ। ঢাকা থেকে দেড় ঘণ্টায় যাওয়া যায়। মাওয়া ফেরিঘাটও একই রকম আকর্ষক। পদ্মা নদীর তীরে বাতাস খাওয়া, মাছ ধরা বা স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়। খরচ খুবই কম—বাসে গেলে ৩০০-৫০০ টাকায় পুরো দিন কাটানো সম্ভব। এছাড়া ধামরাইয়ের ব্রোঞ্জের কারখানা বা জয়দেবপুরের রাজকীয় পরিবেশও দ্রুত ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত। এসব জায়গায় গেলে শুধু বিনোদন নয়, স্থানীয় অর্থনীতিতেও সাহায্য হয়।

কিন্তু কীভাবে এসব ভ্রমণ সাশ্রয়ী ও সহজ করা যায়? বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমে, গ্রুপ করে যাওয়া। চার-পাঁচজন মিলে গেলে খরচ ভাগ হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, সপ্তাহের মাঝামাঝি দিনগুলো বেছে নেওয়া। উইকেন্ডে ভিড় ও দাম বেশি থাকে। তৃতীয়ত, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার। বাস বা ট্রেনে যাওয়া সবচেয়ে সস্তা। পাথাও বা উবারের পরিবর্তে শেয়ার্ড ভ্যান বা লেগুনা ব্যবহার করা যায়। চতুর্থত, আগে থেকে পরিকল্পনা করা। গুগল ম্যাপ, ট্যুর অপারেটর অ্যাপ বা ফেসবুক গ্রুপ থেকে তথ্য নেওয়া। অনেক ট্যুর কোম্পানি এখন ২০০০-৩০০০ টাকায় দিনভর প্যাকেজ অফার করছে, যাতে যাতায়াত, খাবার ও গাইড সব অন্তর্ভুক্ত।

এছাড়া মানসিক প্রস্তুতিও জরুরি। অনেকে ভাবেন, ভ্রমণ মানে বড় খরচ। কিন্তু বাস্তবে ঢাকার কাছাকাছি জায়গায় একদিনের ভ্রমণে ১০০০-২০০০ টাকায় অনেক কিছু সম্ভব। এতে শুধু শারীরিক ব্যায়াম বাড়ে না, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয়, সংস্কৃতি জানা এবং প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া যায়। একজন পর্যটন বিশেষজ্ঞ বলেন, “ঢাকার যুবকরা যদি প্রতি মাসে একবারও দিনভর ভ্রমণ করেন, তাহলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ৩০ শতাংশ উন্নত হতে পারে। এছাড়া দেশীয় পর্যটন খাতও শক্তিশালী হবে।”

সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে, কিছু যুবগোষ্ঠী এই পরিবর্তন শুরু করেছে। ফেসবুক গ্রুপগুলোতে ‘ঢাকা ডে ট্রিপ’ বা ‘বাজেট ট্রাভেল বাংলাদেশ’ এর মতো কমিউনিটি জনপ্রিয়। তারা শেয়ার করে কীভাবে সোনারগাঁওয়ে গিয়ে পুরনো ইতিহাস দেখলেন বা ভাওয়ালে পিকনিক করলেন। এমনকি ক্যাফে মালিকরাও এখন কিছু জায়গায় আউটডোর ইভেন্ট আয়োজন করছেন, যাতে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে প্রকৃতিতে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নিরাপত্তা, আবহাওয়া এবং পরিবহনের অসুবিধা অনেককে নিরুৎসাহিত করে। সমাধান হিসেবে স্থানীয় ট্যুর গাইড নেওয়া, আবহাওয়া অ্যাপ চেক করা এবং জরুরি নম্বর সঙ্গে রাখা উচিত। সরকারি উদ্যোগেও পর্যটন প্রচার বাড়ানো দরকার। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড যদি ঢাকার আশেপাশের স্পটগুলোকে আরও প্রচার করে, তাহলে যুবসমাজ সাড়া দেবে।

শেষ কথা, ঢাকার ক্যাফে-রেস্তোরাঁগুলো অবশ্যই সামাজিক জীবনের অংশ। কিন্তু এর বাইরে বেরিয়ে আসা জরুরি। প্রকৃত ভ্রমণ শুধু বিনোদন নয়, এটা জীবনকে সমৃদ্ধ করে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয় এবং দেশকে ভালোবাসতে শেখায়। আজ থেকেই একটা ছোট পরিকল্পনা করুন—সোনারগাঁও বা ভাওয়ালের টিকিট কাটুন। দেখবেন, কংক্রিটের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে একটা নতুন ঢাকা আবিষ্কার করবেন। ঢাকাবাসীদের জন্য এটাই হোক প্রকৃত ‘ভ্রমণের’ শুরু।

প্রতিবেদক: মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও ঢাকায় শুরু হলো ‘ক্লিন অ্যাজ ইউ গো’ পরিচ্ছন্নতা অভিযান

Read Next

রামধনু দ্বীপের রহস্য: হরমুজের বহুবর্ণ ভূখণ্ড যেখানে প্রকৃতি নিজেই শিল্পী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular