১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রমনার বটমূলে সুরের জোয়ারে বরণ করা হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩

নিজস্ব প্রতিবেদক।পর্যটন সংবাদ : সূর্যোদয়ের প্রথম আলোয় রাজধানীর রমনা উদ্যানের ঐতিহ্যবাহী বটমূলে আজ সকালে শুরু হয়েছে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-কে স্বাগত জানাতে ভোরের সোনালি আলোয় মিশে গেছে সম্মেলক কণ্ঠের গান। সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মাধ্যমে শুরু হয় এই প্রভাতি আয়োজন, যা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে হাজারো দর্শক-শ্রোতার হৃদয়ে।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই পরিবেশিত হয় ‘এ কী সুগন্ধহিল্লোল বহিল’ এবং ‘তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে’—দুটি গান। এর মাধ্যমে নতুন বছরের আনন্দময় সুরেলা যাত্রা শুরু হয়। এবারের অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর পঙক্তি ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। এই ভাবনাকে কেন্দ্র করে পুরো আয়োজন সাজানো হয়েছে, যা ভয়মুক্ত চিত্ত ও উন্নত মনোভাবের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ছায়ানটের এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁই, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ ও জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের গানসহ বিভিন্ন লোকগান পরিবেশিত হয়। মোট ২২টি গানের মধ্যে ৮টি সম্মেলক কণ্ঠে এবং ১৪টি একক কণ্ঠে গাওয়া হয়। এছাড়া দুটি পাঠও অন্তর্ভুক্ত ছিল। শিশু বিভাগের শিক্ষার্থীসহ ছায়ানটের সব বিভাগের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং বিশিষ্ট শিল্পী মিলিয়ে প্রায় ২০০ জন শিল্পী এতে অংশ নেন। তাদের সম্মিলিত কণ্ঠে রমনার বটমূল যেন একটি বড় সাংস্কৃতিক মঞ্চে পরিণত হয়।

অনুষ্ঠানটি প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে। এ সময় দর্শকরা গানের তালে তালে নতুন বছরকে বরণ করে নেন। ছায়ানট থেকে আগেই জানানো হয়েছিল যে, এবারের আয়োজন হবে ভয়ের পরিবেশ থেকে বেরিয়ে সংগীতের মাধ্যমে বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় তুলে ধরার এক অনন্য উদাহরণ। পয়লা বৈশাখের এই অনুষ্ঠান কালক্রমে দেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এক অভিন্ন উৎসবে রূপ নিয়েছে। এটি শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার এই বটমূলে পয়লা বৈশাখে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে। প্রায় ছয় দশক ধরে এই ঐতিহ্য অব্যাহত রয়েছে। প্রতি বছর সূর্যোদয়ের পর থেকে শুরু হয়ে এই আয়োজন হাজারো মানুষকে একত্রিত করে। এবারও অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে বিটিভি ও দীপ্ত টেলিভিশন। প্রথম আলো এবং বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েব পোর্টালেও লাইভ দেখা গেছে। এছাড়া ছায়ানটের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে, যাতে দেশ-বিদেশের বাঙালিরা যুক্ত হতে পারেন।

এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে লক্ষণীয় ছিল প্রকৃতির সঙ্গে সংগীতের মেলবন্ধন। বটমূলের ছায়ায় দাঁড়িয়ে শিল্পীরা যখন গাইছিলেন, তখন সকালের মৃদু বাতাস, পাখির ডাক এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাস মিলেমিশে এক অপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। অনেকে বলছেন, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিগত বছরের সব সংকট ও চ্যালেঞ্জ পেছনে ফেলে নতুন করে শুরু করার প্রেরণা পাওয়া যায়। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’—এই আদর্শকে সামনে রেখে শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন, যা দর্শকদের মনে গভীর রেখাপাত করে।

ছায়ানটের এই আয়োজন শুধু ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এখন জাতীয় পর্যায়ের একটি সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন নতুন বছরকে বরণ করতে। অনেক পরিবার সকাল থেকেই রমনায় জড়ো হন, শিশুরা গান শুনে উৎসাহিত হয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালি সংস্কৃতির ধারা পৌঁছে যায়। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছায়ানট প্রমাণ করে যে, সংগীত কীভাবে মানুষকে এক করে, ভয় দূর করে এবং আশা জাগায়।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের এই ঐতিহ্য শতাব্দী প্রাচীন। কিন্তু ছায়ানটের বটমূলের অনুষ্ঠান তার এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। ১৯৬৭ সালের সেই প্রথম আয়োজন থেকে আজ পর্যন্ত এটি অবিচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে। প্রতি বছর নতুন ভাবনা, নতুন গান এবং নতুন শিল্পীদের অংশগ্রহণে এটি আরও সমৃদ্ধ হয়। এবারের ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের আয়োজনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। শিল্পীদের নিবেদিত পরিবেশনা এবং দর্শকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা মিলিয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছে স্মরণীয়।

নতুন বছরে সবার জন্য শুভকামনা রেখে ছায়ানটের এই বর্ষবরণ শেষ হয়। তবে তার রেশ থেকে যায় অনেকদিন। এই অনুষ্ঠান শুধু গান নয়, বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐক্য ও সাংস্কৃতিক গর্বের প্রকাশ। আগামী বছরগুলোতেও এই ঐতিহ্য অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা যায়। পয়লা বৈশাখের এই প্রভাতি সুর যেন প্রতি বছর নতুন করে জাগিয়ে তোলে বাঙালির চেতনা।

প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার

Read Previous

পহেলা বৈশাখে ঢাকায় পর্যটনের রঙিন উৎসব: দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ঢল নেমেছে শোভাযাত্রায়

Read Next

বাংলাদেশের পর্যটন খাতে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ সহযোগিতা জোরদারের আশা ব্যক্ত করলেন সৌদি রাষ্ট্রদূত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular