১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পহেলা বৈশাখে ঢাকায় পর্যটনের রঙিন উৎসব: দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ঢল নেমেছে শোভাযাত্রায়

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিতে রাজধানী ঢাকায় পহেলা বৈশাখের বর্ণাঢ্য আয়োজন এবার পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে উঠেছে। ভোরের প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রমনার ঐতিহ্যবাহী বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সেখান থেকে সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হয় বৈশাখী শোভাযাত্রা। এই পুরো আয়োজনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা হাজার হাজার দেশি পর্যটকের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। নানা বয়সি মানুষের ঢল, রঙিন মোটিফ, ঐতিহ্যবাহী গান এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার মিলনমেলা—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পর্যটনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখের এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে। এবারও ভোরবেলায় সম্মিলিত কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গান দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এই অনুষ্ঠানে মোট ২২টি গান পরিবেশিত হয়। গানের সুরে সুরে হাজারো মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠ যেন পুরোনো বছরের ক্লান্তি, গ্লানি ও শোককে বিদায় জানিয়ে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে তোলে। এই আয়োজনকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে তাতে পর্যটকদের উৎসাহে কোনো ভাটা পড়েনি। বরং দেশি পর্যটকরা বলছেন, এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং শেকড়ে ফিরে যাওয়ার আবেগঘন উপলক্ষ।

সকাল ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে শুরু হয় বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা। এবারের শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ ছিল পাঁচটি বিশেষ মোটিফ—মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এই মোটিফগুলো যথাক্রমে শক্তি, সৃজনশীলতা, শান্তি, গৌরব ও গতিশীলতার প্রতীক। বাঁশ, কাঠ ও রঙিন কাগজের কারুকার্যে তৈরি বিশাল এসব প্রতিকৃতি শোভাযাত্রাকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। শোভাযাত্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা বহন করেন এবং ৩৫ জন যন্ত্রশিল্পীর বাঁশি ও দোতারার সুরে বেজে ওঠে ‘এসো হে বৈশাখ’। নানা বয়সি দেশি পর্যটকদের ঢল নেমেছে এই শোভাযাত্রায়। অনেকে পরিবার নিয়ে এসেছেন, শিশুরা রঙিন পোশাকে ছুটোছুটি করছে, আর বয়স্করা আবেগাপ্লুত হয়ে স্মৃতি রোমন্থন করছেন।

এবারের উৎসবে দেশি পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় এসেছেন শুধুমাত্র এই বর্ষবরণ দেখতে। অনেকে বলছেন, পহেলা বৈশাখ তাদের কাছে একটি বার্ষিক পর্যটন অভিজ্ঞতা। ঢাকার হোটেলগুলোতে এ সময় বুকিং বেড়ে যায়। রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোতে পর্যটকদের ভিড় জমে। পান্তা-ইলিশ, ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও স্থানীয় খাবারের স্টলগুলোতে দেশি পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। এই উৎসব দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করে।

বিদেশি পর্যটকদের জন্যও এবারের পহেলা বৈশাখ ছিল এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। যুক্তরাজ্য থেকে আসা পর্যটক এলিজাবেথ থম্পসন (৪৫) বলেন, “আমি বিশ্বের অনেক উৎসব দেখেছি, কিন্তু বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখের মতো প্রাণবন্ত ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব খুব কমই দেখা যায়। রমনার বটমূলে ভোরবেলার গান আর চারুকলার শোভাযাত্রা—সবকিছু মিলিয়ে যেন একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক যাত্রা। এখানে এসে আমি বাংলাদেশের আতিথেয়তা ও ঐতিহ্যের গভীরতা অনুভব করেছি। এটি আমার পর্যটন অভিজ্ঞতার সেরা একটি দিন। আগামী বছর আবার আসব পরিবার নিয়ে।”

ভারতের কলকাতা থেকে আসা রাহুল সেনগুপ্ত (৩২) জানান, “বাংলাদেশ ও ভারতের সাংস্কৃতিক সেতু এই উৎসবে আরও মজবুত হয়। শোভাযাত্রার মোটিফগুলো—বিশেষ করে পায়রা ও দোতারা—অসাধারণ। এখানে দেশি-বিদেশি সবাই একসঙ্গে উৎসবে মেতেছে, কোনো ভেদাভেদ নেই। পর্যটক হিসেবে আমি সত্যিকারের বাঙালি উৎসবের স্বাদ পেয়েছি। বাংলাদেশের এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্বের কাছে আরও প্রচার করা উচিত।”

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে আসা জন মার্টিন (৫৮) মুগ্ধ হয়ে বলেন, “এতগুলো মানুষ একসঙ্গে গান গাইছে, নাচছে, শোভাযাত্রায় অংশ নিচ্ছে—এটা শুধু দেখার নয়, অনুভব করার মতো। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পর্যটনের জন্য পহেলা বৈশাখ সত্যিই এক অসাধারণ সম্পদ। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভালো ছিল, খাবারদাবার চমৎকার। আমি আমার বন্ধুদের বলব, বাংলাদেশে এসে এই উৎসব না দেখলে অনেক কিছু মিস করা হয়।”

এই উৎসব শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সারা দেশেই পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়েছে। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে। পর্যটকরা এসব স্থানেও ভিড় করেছেন। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এলাকায় পান্তা-ইলিশের স্টল, হস্তশিল্পের দোকান ও নৌকা ভ্রমণ পর্যটকদের আকর্ষণ করেছে। হোটেলগুলোতে বৈশাখী ফুড ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে দেশি-বিদেশি অতিথিরা ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিয়েছেন।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করেন, পহেলা বৈশাখের মতো উৎসব দেশের সাংস্কৃতিক পর্যটনকে সমৃদ্ধ করে। এটি শুধু অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, বরং বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরে। জাতীয় সংগীতের সম্মিলিত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় রমনার অনুষ্ঠান। কিন্তু পর্যটকদের মনে এই উৎসবের স্মৃতি রয়ে যাবে অনেকদিন।

পহেলা বৈশাখের এই আয়োজন প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ নয়, সাংস্কৃতিক সম্পদেরও এক অমূল্য ভাণ্ডার। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অংশগ্রহণ এই উৎসবকে আরও বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। আগামী বছরগুলোতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প আরও শক্তিশালী হবে। নতুন বছর সবার জীবনে আনুক শান্তি, সমৃদ্ধি ও নতুন আশা। শুভ নববর্ষ ১৪৩৩।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

হজযাত্রীদের স্বস্তি: আগামী বছর বিমানভাড়া কমতে পারে ২০ হাজার টাকা

Read Next

রমনার বটমূলে সুরের জোয়ারে বরণ করা হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular