
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশ তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের আকর্ষণ করে। কক্সবাজারের বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সিলেটের চা-বাগান, বান্দরবান-রাঙামাটির পাহাড়ি দৃশ্য, সুন্দরবনের অরণ্য এবং ঢাকা-চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থানগুলো প্রতি বছর লাখ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটককে টেনে আনে। কিন্তু এসব পর্যটন কেন্দ্রের অধিকাংশই রাত্রিকালীন সময়ে পর্যটকদের জন্য নিরাপদ নয়। রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, হয়রানি, রাহাজানি এবং এমনকি সহিংসতার ঘটনা বেড়ে যায়। এই নিরাপত্তাহীনতা শুধু পর্যটকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, পুরো পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যতকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভ্রমণ উপদেষ্টা সংস্থা যেমন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাতে একা চলাচল না করার পরামর্শ দিয়ে থাকে। এই সমস্যার গভীর কারণ অনুসন্ধান এবং সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা জরুরি, যাতে বাংলাদেশ সত্যিকারের একটি নিরাপদ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
প্রথমত, অবকাঠামোগত দুর্বলতা রাত্রিকালীন নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ।বাংলাদেশের অধিকাংশ পর্যটন কেন্দ্র গ্রামীণ বা দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতের অনেক অংশে রাতে আলোর ব্যবস্থা নেই, রাস্তায় বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত। ফলে অন্ধকারে পর্যটকরা সহজেই ছিনতাইকারীদের টার্গেটে পরিণত হন। সিলেটের চা-বাগান বা বান্দরবানের পাহাড়ি রাস্তায় রাতে গাড়ি চলাচল করা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ রাস্তা সরু, আলোকিত নয় এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা উঁচু। একইভাবে সুন্দরবন বা রাঙামাটির নদীপথে নৌকা ভ্রমণে রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি খুবই কম। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে রাস্তায় বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এছাড়া পাবলিক ট্রান্সপোর্ট যেমন বাস, সিএনজি বা রিকশায় রাতে চলাচলকারী পর্যটকরা প্রায়ই ছিনতাই বা হয়রানির শিকার হন।
দ্বিতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অপর্যাপ্ত উপস্থিতি ও কার্যকারিতা। দেশে টুরিস্ট পুলিশ থাকলেও তাদের সংখ্যা এবং রাত্রিকালীন টহল অপর্যাপ্ত। কক্সবাজারের মতো ব্যস্ত পর্যটন এলাকায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টুরিস্ট পুলিশ ২৫ জন ডাকাত, ৩৪ জন ভাসমান অপরাধী, ৮ জন ইভ-টিজার এবং ৩ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায় সমস্যা কতটা গভীর। তবু রাতে সমুদ্রসৈকতের নির্জন অংশে মগিং, ব্যাগ ছিনতাই এবং হয়রানির ঘটনা অহরহ ঘটে। পাহাড়ি এলাকায় যেমন বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ এবং অপহরণের ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ উপদেষ্টায় এসব এলাকায় ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফলে পর্যটকরা রাতে হোটেলের বাইরে বের হতে ভয় পান।
তৃতীয়ত, সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণগুলো এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশের উচ্চ জনসংখ্যা, বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য অনেক অপরাধের মূল কারণ। পর্যটন এলাকায় স্থানীয় যুবকদের মধ্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। বিশেষ করে নারী পর্যটকদের ক্ষেত্রে ইভ-টিজিং বা যৌন হয়রানি একটি বড় সমস্যা। কক্সবাজারে একাধিক ঘটনায় পর্যটকদের বিরুদ্ধে এক্সটর্শন র্যাকেট চালু থাকার খবর পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল বা আন্দোলনের সময় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা আরও খারাপ হয়। এছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক চোরাচালান ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতি রাতের নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে। ফলে বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা কমছে এবং দেশি পর্যটকরাও রাতে বাইরে থাকতে চান না।
এই নিরাপত্তাহীনতার প্রভাবসুদূরপ্রসারী। পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। ২০২৩ সালে প্রায় ৬ লাখ ৫৫ হাজার বিদেশি পর্যটক এসেছিলেন, কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে এ সংখ্যা বাড়ছে না। দেশি পর্যটকরাও রাত্রিকালীন ভ্রমণ এড়িয়ে চলেন, ফলে হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নেতিবাচক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খবর বাংলাদেশের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে এই সমস্যা থেকে মুক্তির উপায় রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে টুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। কক্সবাজারে টুরিস্ট পুলিশের সাম্প্রতিক সাফল্য দেখিয়ে আরও জেলায় এই বাহিনীকে শক্তিশালী করতে হবে। রাত্রিকালীন টহল, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং আলোকিত রাস্তার ব্যবস্থা করা দরকার। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা গাইডলাইন প্রকাশ করতে হবে এবং অ্যাপের মাধ্যমে জরুরি সাহায্যের ব্যবস্থা করতে হবে। পাহাড়ি এলাকায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে কমিউনিটি-ভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বেসরকারি খাতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে নিজস্ব সিকিউরিটি টিম রাখা, গাইডেড ট্যুরের ব্যবস্থা এবং রাত্রিকালীন পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেতে পারে। সরকার-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) আলোকায়ন প্রকল্প, রাস্তা উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষিত গাইড তৈরির কর্মসূচি চালু করা উচিত। এছাড়া পর্যটকদের সচেতনতা বাড়াতে ওয়ার্কশপ, অনলাইন ক্যাম্পেইন এবং স্থানীয় জনগণকে পর্যটন-সচেতন করে তোলা দরকার। দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অপরাধ কমানো সম্ভব।
পরিশেষে, বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোকে রাত্রিকালীন নিরাপদ করতে পারলে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক ইমেজ উন্নত হবে। সরকার, প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ এবং পর্যটকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। যদি এখনই পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার একটি নিরাপদ ও আকর্ষক পর্যটন গন্তব্য। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে পর্যটনের স্বপ্ন সফল হবে না—এটাই বাস্তবতা।



