
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : গ্রামীণ বাংলার মেলায় একসময় রাতের আকাশে বাদ্যযন্ত্রের সুর আর গায়কের কণ্ঠে মুখরিত হতো পুতুল নাচের আসর। কাঠ, শোলা আর রঙিন কাপড়ে তৈরি পুতুলগুলো সুতোর টানে নেচে নেচে তুলে ধরত রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনি, বেহুলা-লখিন্দরের প্রেম, সাত ভাই চম্পার গল্প কিংবা সমকালীন সামাজিক বার্তা। এটি ছিল আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, শিশু-কিশোর থেকে বয়স্ক সকলের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু আজকের ডিজিটাল যুগে গ্রামীণ ঐতিহ্য দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। মেলায় পুতুল নাচের দলগুলো প্রায় বিলুপ্তির পথে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একসময় ডজন ডজন দল সক্রিয় ছিল, এখন মাত্র কয়েকটি টিকে আছে। এই ঐতিহ্যের ক্ষয় কেন ঘটছে এবং কীভাবে তা ধরে রাখা যায়—এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা জরুরি, কারণ এটি শুধু একটি শিল্প নয়, বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক।
পুতুল নাচের ইতিহাস বাংলায় চৌদ্দ শতকের শেষভাগ থেকে শুরু। বাংলার পুতুল নাচ মূলত রড পুতুল (দাঙ্গ পুতুল নাচ), গ্লাভ পুতুল (বেনি পুতুল) এবং স্ট্রিং পুতুল (তারের পুতুল) নিয়ে গঠিত। রাজস্থানের কথপুতলি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অবিভক্ত বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশের বগুড়া-রাজশাহী অঞ্চলে) এর বিকাশ ঘটে। পুতুল তৈরিতে ব্যবহৃত হয় কাঠ, মাটি, শোলা, পাটের আঁশ আর প্রাকৃতিক রং। পুতুলের মাথা মাটির, শরীর কাঠের, পোশাক রঙিন কাপড়ের—যা গ্রামীণ শিল্পীদের সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে। মেলায় বা উৎসবে এই পুতুল নাচ তিন-চার ঘণ্টা চলত। গায়ক, বাদক আর পর্দার আড়ালে পুতুলচালক মিলে একটি পুরো দল গড়ে উঠত। এটি শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষামূলকও ছিল—সামাজিক অসঙ্গতি, নীতিকথা আর ধর্মীয় কাহিনি তুলে ধরে মানুষকে আলোড়িত করত। মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে পুতুল নাচের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা প্রচার করা হয়েছে, যা এর জাতীয় গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু আজ এই ঐতিহ্য ক্ষয়িষ্ণু। সবচেয়ে বড় কারণ আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসন। টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট আর ইউটিউবের কারণে গ্রামের মানুষ আর মেলায় গিয়ে পুতুল নাচ দেখতে চায় না। শিশুরা এখন কার্টুন আর অনলাইন গেমসে আসক্ত। একসময় মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল পুতুল নাচ, যাত্রাপালা আর সার্কাস—এখন সেগুলোর স্থান দখল করেছে ডিজিটাল বিনোদন। অর্থনৈতিক কারণও কম নয়। পুতুলশিল্পীরা অধিকাংশই গ্রামীণ কৃষক বা দিনমজুর। পুতুল নাচ থেকে আয় এত কম যে তারা কৃষি, জেলে কিংবা শ্রমিকের কাজে চলে যাচ্ছেন। যুব প্রজন্ম এই পেশায় আগ্রহী নয়, কারণ এতে সম্মান কম এবং জীবিকা অনিশ্চিত। অনেক পরিবারে বাবা-দাদা শিল্পী হলেও সন্তানরা শহরে চাকরি খুঁজছে। উপরন্তু, কিছু অসাধু ব্যক্তি পুতুল নাচের আড়ালে অশ্লীল নাচ দেখিয়ে যুবসমাজকে বিপথগামী করায় প্রশাসন অনেক মেলায় এটি নিষিদ্ধ করেছে। ফলে সরকারি অনুমতি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ধর্মীয় কট্টরতা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবও এর পতন ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশে পুতুল নাচের বর্তমান চিত্র হতাশাজনক। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ‘মনিকা পুতুল নাচ ও থিয়েটার’ দলের মতো কয়েকটি দল এখনও টিকে আছে, যেখানে রাম বনবাস, রাজা হরিশ্চন্দ্র, রাবণবধের মতো পালা এখনও মঞ্চস্থ হয়। কিন্তু দেশজুড়ে এমন দলের সংখ্যা হাতে গোনা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একসময় এর প্রধান কেন্দ্র ছিল, এখন সেখানেও সংকট। শিল্পীরা পুতুল তৈরির উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন পুতুল বানাতে পারছেন না। অনেক পুরনো পুতুল নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান আমল থেকেই ধর্মীয় কারণে এর বিরোধিতা শুরু হয়েছে, যা স্বাধীনতার পরও চলছে।
তবে এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখা অসম্ভব নয়। প্রথমত, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। বাংলাদেশ লোকশিল্প ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন (১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত) ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণ, মিউজিয়াম এবং লোক উৎসবের মাধ্যমে কিছু কাজ করছে। জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে—দলগুলোকে নিবন্ধন, ভাতা এবং অনুষ্ঠানের সুযোগ দিয়ে। কুড়িগ্রামের মতো জেলায় যেভাবে কয়েকজন শিল্পীকে সরকারি ভাতা দেওয়া হয়েছে, তা সারাদেশে বিস্তার করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি। স্কুল-কলেজে পুতুল নাচের ওয়ার্কশপ আয়োজন করে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতে হবে। তৃতীয়ত, পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা। গ্রামীণ মেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবে পুতুল নাচকে প্রধান আকর্ষণ করে বিদেশি ও দেশি পর্যটকদের টানা যায়। এতে শিল্পীদের আয় বাড়বে।
চতুর্থত, মিডিয়া ও প্রযুক্তির ব্যবহার। ইউটিউব, ফেসবুক এবং টেলিভিশনে ডকুমেন্টারি, লাইভ শো করে পুতুল নাচকে জনপ্রিয় করা সম্ভব। এর মাধ্যমে সামাজিক বার্তা (যেমন স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নারী শিক্ষা) ছড়ানো যাবে। পঞ্চমত, এনজিও ও বেসরকারি উদ্যোগ। ব্র্যাক, আড়ংসহ প্রতিষ্ঠানগুলো হস্তশিল্পের মতো পুতুল তৈরি ও নাচকে সমর্থন করতে পারে। পুতুল তৈরির কারিগরদের প্রশিক্ষণ ও বাজার সৃষ্টি করা দরকার। ষষ্ঠত, সচেতনতা অভিযান। গ্রামীণ মেলায় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নিরাপদভাবে পুতুল নাচের অনুমতি দিয়ে অশ্লীলতার অভিযোগ দূর করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত পুতুল নাচ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
এছাড়া, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আনা যেতে পারে। ইউনেস্কোর অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় পুতুল নাচকে অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করলে বিশ্বব্যাপী প্রচার পাবে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও লোকশিল্প ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পুতুলের সংগ্রহশালা গড়ে তোলা এবং বার্ষিক লোক উৎসব আয়োজন করা যায়। শিল্পীদের সন্তানদের জন্য বৃত্তি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করলে পরবর্তী প্রজন্মকে ধরে রাখা সম্ভব।
পুতুল নাচ শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এটি হারিয়ে গেলে বাংলার গ্রামীণ জীবনের রসবোধ, কল্পনাশক্তি এবং সম্প্রদায়বোধও হারাবে। সরকার, সুশীল সমাজ, শিল্পী ও নতুন প্রজন্মের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। মেলায় আবার যেন পুতুলের নাচে গ্রামবাংলা মুখর হয়ে ওঠে—এই আশাই আজকের সময়ের দাবি। যদি আমরা এখনই পদক্ষেপ না নিই, তাহলে আগামী প্রজন্ম শুধু বইয়ের পাতায় বা ভিডিওতে এই ঐতিহ্য দেখবে, জীবন্তভাবে অনুভব করতে পারবে না। বাংলার আবহমান সংস্কৃতি রক্ষায় পুতুল নাচের পুনরুজ্জীবন তাই অপরিহার্য।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



