১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জামালপুরের কাঁসা শিল্প: বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্ত থেকে পর্যটনের নতুন আলোয় উজ্জ্বল হওয়ার সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার কাঁসারীপাড়ায় সকালের প্রথম আলোয় এখনও মাঝে মাঝে টুং-টাং শব্দ ভেসে আসে। একসময় এই শব্দটাই ছিল এলাকার প্রাণ। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ফকিরপাড়া গ্রাম থেকে শুরু হয়ে কাঁসারীপাড়া নামে খ্যাত এই ছোট্ট অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল শিল্প। কাঁসার থালা, বাটি, গ্লাস, বদনা, কলস, ঘটি—সবই হাতে গড়া, নান্দনিক কারুকাজে ভরা। আজকের দিনে এই শিল্প বিলুপ্তির পথে হাঁটলেও পর্যটনের ছোঁয়ায় এটিকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন স্থানীয়রা। পর্যটকরা যদি এই গ্রামে এসে কারিগরদের হাতের কাজ দেখেন, ঐতিহ্যের স্বাদ নেন এবং স্মৃতি হিসেবে কাঁসার সামগ্রী কিনে নিয়ে যান, তাহলে শিল্পটি শুধু বেঁচে থাকবে না, পর্যটন অর্থনীতিতেও নতুন মাত্রা যোগ করবে।

কাঁসা শিল্পের ইতিহাস আবহমান বাংলার সঙ্গে জড়িত। নৃবিজ্ঞানীদের মতে এটি প্রাচীন ব্রোঞ্জ যুগের ধারাবাহিকতা। অনেকে এটিকে রামায়ণ-মহাভারতের যুগের বলে মনে করেন। ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুসারে, ঢাকার ধামরাই থেকে কাঁসার শিল্পীরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। মুঘল ও ব্রিটিশ আমলে নদীপথের সুবিধায় ইসলামপুরে এই শিল্পের বিকাশ ঘটে। পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে কারিগররা একই পাড়ায় বসবাস করতেন, যার ফলে এলাকাটি কাঁসারীপাড়া নামে পরিচিত হয়। বিয়ে-শাদি, আকিকা, পূজা-পার্বণ, মুসলমানি অনুষ্ঠানে কাঁসার তৈজসপত্র উপহার হিসেবে অপরিহার্য ছিল। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ঘরেই এর ব্যবহার ছিল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কাঁসার অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণের কারণে প্রাচীনকালে জটিল রোগব্যাধি কম ছিল। আধুনিক টিন, অ্যালুমিনিয়াম বা প্লাস্টিকের তুলনায় কাঁসা স্বাস্থ্যকর বলে অনেকে এখনও এর দিকে ঝুঁকছেন।

কাঁসা তৈরির প্রক্রিয়া একটি শিল্পকলা। কাঁসা মূলত একটি মিশ্র ধাতু—৮০০ গ্রাম তামা (কপার) এর সঙ্গে ২০০ গ্রাম টিন অ্যাংগট (রাং) মিশিয়ে আগুনে পোড়ানো হয়। এক কেজি কাঁসা তৈরি হয় এভাবে। তামা, দস্তা, রুপা বা অন্য ধাতুর অনুপাত নির্ভর করে পণ্যের স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা, মসৃণতা ও উজ্জ্বলতার ওপর। এই মিশ্রণ প্রক্রিয়া কারিগর সম্প্রদায়ের গোপনীয়তা। গলিত কাঁসা ঢালাই করে তারপর হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে (হাতে পিটিয়ে) আকার দেওয়া হয়। থালা, বাটি, গ্লাস—সবকিছু নিপুণ হাতে গড়া। পরে পালিশ করে চকচকে করা হয়। কাকডাকা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলত এই কাজ। একসময় কারখানাগুলোতে টুং-টাং শব্দে মুখরিত থাকত পুরো এলাকা। দিনরাত কাজ করে সারা দেশের চাহিদা মেটাতেন কারিগররা।

১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার লন্ডনের বার্মিংহামে বিশ্ব হস্তশিল্প প্রদর্শনী আয়োজন করে। সেখানে ইসলামপুরের প্রয়াত শিল্পী জগৎচন্দ্র কর্মকার তাঁর কারুকাজপূর্ণ কাঁসার পণ্য প্রদর্শন করেন। ফলস্বরূপ ইসলামপুরের কাঁসা শিল্প স্বর্ণপদক লাভ করে এবং বিশ্ববিখ্যাত হয়ে ওঠে। দেশের গণ্ডিপেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো এই পণ্য। সারাদেশ থেকে ব্যবসায়ীরা ভিড় জমাতেন ইসলামপুরে। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই জৌলুস হারিয়ে গেছে। প্লাস্টিক, মেলামাইন, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের সস্তা বিকল্পের কারণে কাঁসার চাহিদা কমেছে। কাঁচামালের দাম বেড়েছে, উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে ক্রেতারা দামি কাঁসা কিনতে অনীহা দেখান। বর্তমানে মাত্র ৭-৮টি প্রতিষ্ঠান এই শিল্পকে কোনোমতে টিকিয়ে রেখেছে। অনেক কারিগর বাঁচার তাগিদে পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে গেছেন।

ইসলামপুর বাজারের দুর্গা বাসনালয়ের মালিক নারায়ণ কর্মকার বলেন, “আমি পারিবারিকভাবে এ প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছি। সময়ের পরিবর্তনে অনেকে এ ব্যবসা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। এ পেশাটি টিকিয়ে রাখতে আমরা সরকারের সহযোগিতা চাই। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ এবং শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিলে আমরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব।” তাঁর কথায় স্পষ্ট হয়, শিল্পীরা এখনও আশা ছাড়েননি।

এখানেই পর্যটনের ছাপ পড়ে। জামালপুরের কাঁসা শিল্পকে যদি পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি শুধু বাঁচবে না, অর্থনীতিতেও অবদান রাখবে। কল্পনা করুন—পর্যটকরা ব্রহ্মপুত্র নদের তীর দিয়ে নৌকা ভ্রমণ করে কাঁসারীপাড়ায় পৌঁছান। সেখানে ওয়ার্কশপে বসে দেখেন কারিগররা কীভাবে গলিত কাঁসা ঢালাই করছেন, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আকার দিচ্ছেন। লাইভ ডেমোনস্ট্রেশন, কারুকাজের গল্প শোনা, হাতে তৈরি কাঁসার স্মারক কেনা—এসবই পর্যটকদের আকর্ষণ করবে। ইসলামপুরকে “কাঁসা শিল্প গ্রাম”হিসেবে গড়ে তোলা যায়। হোমস্টে, ক্রাফট ট্যুর, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—এগুলো যুক্ত করলে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আসবেন। জামালপুর জেলার অন্যান্য আকর্ষণ যেমন শিশু গুম্বদ, নদীতীরের সৌন্দর্যের সঙ্গে এটি মিলিয়ে একটি সম্পূর্ণ ঐতিহ্য-পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা সম্ভব।

স্থানীয় পর্যটন কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, “জামালপুরের পর্যটন উন্নয়নে কাঁসা শিল্পকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এখানে কারিগরদের প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ উন্মুক্ত করা এবং অনলাইন-অফলাইন মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পরিকল্পনা চলছে। পর্যটকরা এলে কারিগররা উৎসাহ পাবেন, বিক্রি বাড়বে এবং শিল্পটি টিকে থাকবে।” ঢাকা থেকে আসা এক পর্যটক রিয়া আহমেদের অভিজ্ঞতা আরও উৎসাহব্যঞ্জক। তিনি বলেন, “প্রথমবার কাঁসারীপাড়ায় এসে কারিগরদের হাতের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। এটা শুধু পণ্য নয়, সংস্কৃতির অংশ। আমি একটি থালা-বাটির সেট কিনে নিয়ে গেছি। এমন অভিজ্ঞতা আর কোথাও পাইনি। পর্যটন মন্ত্রণালয় যদি এখানে ট্যুর প্যাকেজ চালু করে, তাহলে অনেকেই আসবে।”

কাঁসা শিল্পের সঙ্গে পর্যটনের যোগসূত্র শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও। এটি যুবসমাজকে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফরে আসতে পারবে। আন্তর্জাতিক পর্যটকরা বাংলার হস্তশিল্পের স্বাদ নেবেন। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যদি কাঁসারীপাড়াকে হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করা হয়, ওয়ার্কশপগুলোকে পর্যটক-বান্ধব করা হয়, তাহলে শিল্পীরা নতুন করে উদ্যমপাবেন। বর্তমানে যে ৭-৮টি প্রতিষ্ঠান টিকে আছে, তারা অনলাইনে বিক্রি শুরু করেছেন। কিন্তু পর্যটনের মাধ্যমে সরাসরি বিক্রি এবং অভিজ্ঞতা বিক্রি করলে আয় বাড়বে।

চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে। কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, মার্কেটিং—সবকিছু দরকার। তবু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। জামালপুর জেলা প্রশাসন এবং পর্যটন বোর্ড যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করে, তাহলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও বিশ্বমানচিত্রে স্থান করে নেবে।পর্যটকদের পদচারণায় আবারও মুখরিত হয়ে উঠবে কাঁসারীপাড়া। টুং-টাং শব্দ শুধু কারখানার নয়, পর্যটনের সাফল্যেরও প্রতীক হয়ে উঠবে।

এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়িত্ব। কাঁসা শিল্প শুধু একটি পেশা নয়—এটি বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং শিল্পীর নিপুণতার প্রতীক। পর্যটনের ছোঁয়ায় যদি এটি পুনরুজ্জীবিত হয়, তাহলে জামালপুর শুধু কৃষি ও নদীর জন্য নয়, কাঁসা শিল্পের জন্যও বিখ্যাত হয়ে উঠবে। পর্যটকরা আসুন, দেখুন, কিনুন এবং এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখুন। জামালপুরের কাঁসা শিল্পের ভবিষ্যৎ এখন পর্যটনের হাতে—একটি উজ্জ্বল, টিকে থাকা ভবিষ্যৎ।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

বসন্তের রঙিন ফুলে সেজে উঠেছে সুন্দরবন, পর্যটকদের জন্য মধু আহরণ মৌসুমের আকর্ষণীয় সময়

Read Next

ঈদের টানা ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়, ৬০০ কোটি টাকার বাণিজ্যে চাঙা পর্যটন খাত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular