
সুন্দরবন, ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বসন্তের এই মনোরম সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন যেন প্রকৃতির এক অপরূপ চিত্রকলায় রূপান্তরিত হয়েছে। খলিশা, গরান, পশুর, হারগোজা, কেওড়া ও গেওয়াসহ নানা প্রজাতির গাছে ফুটেছে রংবেরঙের ফুল। ফুলের মিষ্টি সুবাস আর মৌমাছির অবিরাম গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো বনাঞ্চল। এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখন শুধু স্থানীয় মৌয়ালদের নয়, দেশি-বিদেশি পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করছে। অনেক পর্যটক এই সময়ে সুন্দরবন ভ্রমণের প্যাকেজ বেছে নিচ্ছেন ফুলের সমারোহ ও ঐতিহ্যবাহী মধু আহরণের দৃশ্য দেখার জন্য।
বন বিভাগের তথ্য অনুসারে, আগামী ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু ও মোম সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হবে, যা ৩১ মে পর্যন্ত টানা দুই মাস চলবে। এ বছর খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকায় ১৮০০ কুইন্টাল মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর প্রায় ২৮৫৩ জন মৌয়াল ১৪২৯ কুইন্টাল মধু ও ৪২৯ কুইন্টাল মোম সংগ্রহ করেছিলেন। এই মৌসুম শুধু অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে।
সম্প্রতি খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীপথ ধরে সুন্দরবনে প্রবেশ করলে চোখ জুড়িয়ে যায় খলিশা, গরান ও পশুর গাছের ফুলের ঝাঁক। উজ্জ্বল রঙের ফুলে বনভূমি যেন নতুন করে সেজে উঠেছে। কেওড়ার ডালে কুঁড়ির মেলা, কাঁটায় ভরা হারগোজা গাছ ফুলে ভরপুর। কচি সবুজ পাতা, শ্বাসমূলের বিস্তার এবং ফুলের সমারোহ বনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। এই রূপমুগ্ধকর পরিবেশে মৌমাছিরা ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। পর্যটকরা নৌকায় করে ঘুরে এই দৃশ্য উপভোগ করছেন এবং ছবি তুলছেন।
সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় প্রধানত এপিস ডরসাটা, এপিস সেরানা ও এপিস ফ্লোরিয়া প্রজাতির মৌমাছি দেখা যায়। এর মধ্যে এপিস ডরসাটা অর্থনৈতিক ও পর্যটন উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। মৌসুমের শুরুতে এসব মৌমাছি প্রায়ই নিচু ডালে চাক বাঁধে, যা নৌকা থেকে দেখা যায়। আগাম মধু চুরি রোধে বন বিভাগ টহল জোরদার করেছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায়ও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই সময়ে সুন্দরবন ভ্রমণ অনেক পর্যটকের কাছে অ্যাডভেঞ্চার ও প্রকৃতি উপভোগের অনন্য সুযোগ।মৌয়ালদের নৌকা প্রস্তুতি, ফুলের মাঝে মৌমাছির গুঞ্জন এবং বনের গভীরে মধু সংগ্রহের ঐতিহ্যবাহী দৃশ্য দেখে অনেকে মুগ্ধ হন। কিছু ট্যুর অপারেটর এখন বিশেষ ‘মধু আহরণ অভিজ্ঞতা’ প্যাকেজ চালু করেছেন, যেখানে পর্যটকরা নিরাপদ দূরত্ব থেকে মৌয়ালদের কাজ দেখতে পান, সুন্দরবনের ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করেন এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত খাঁটি সুন্দরবন মধু কিনতে পারেন।
মৌয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌসুমের শুরুতে খলিশা ফুল থেকে আসা মধু স্বচ্ছ, নারকেল তেলের মতো দেখতে, স্বাদে ঘন, মিষ্টি এবং ঝাঁজবিহীন। এরপর ধাপে ধাপে গরান, কাঁকড়া, হারগোজা এবং শেষে কেওড়া-গেওয়া ফুলের মধু পাওয়া যায়। সময়মতো বৃষ্টি না হলে ফুল ঝরে পড়ে এবং মধুর উৎপাদন কমে যায়। পর্যটকরা এই মধু কিনে নিয়ে যান, কারণ সুন্দরবনের মধু তার প্রাকৃতিক গুণ ও স্বাদের জন্য বিখ্যাত।
সুন্দরবন সংলগ্ন শাকবাড়িয়া ও কপোতাক্ষ নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে এখন মৌয়ালদের পাশাপাশি পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যস্ততাও বেড়েছে। নদীর ধারে নৌকা মেরামত, রসদ জোগাড় এবং পর্যটকদের জন্য লঞ্চ-নৌকা প্রস্তুতির দৃশ্য চোখে পড়ে। পর্যটকরা সুন্দরবনের এই ফুলের মৌসুমকে ‘বসন্তের সুন্দরবন’ নামে অভিহিত করছেন। অনেকে বলেন, এই সময়ে বনের সৌন্দর্য যেন আরও জীবন্ত ও রঙিন হয়ে ওঠে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বছর মধু আহরণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে। একজন মৌয়াল ১৪ দিনের অনুমতিতে সর্বোচ্চ ৫০ কেজি মধু ও ১৫ কেজি মোম সংগ্রহ করতে পারবেন। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ট্যুর প্যাকেজ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবনের এই মৌসুম পর্যটন শিল্পের জন্যও সম্ভাবনাময়। ফুলের সৌন্দর্য, মৌমাছির গুঞ্জন, মৌয়ালদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা এবং খাঁটি বন্য মধু—সব মিলিয়ে এটি একটি অনন্য অভিজ্ঞতা। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং বন্যপ্রাণীর ঝুঁকি মোকাবিলায় সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। পর্যটকদের উচিত নিরাপদ নিয়ম মেনে ভ্রমণ করা এবং বনের পরিবেশ রক্ষায় সহযোগিতা করা।
যারা প্রকৃতি, অ্যাডভেঞ্চার এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা পছন্দ করেন, তাদের জন্য বসন্তের এই সময় সুন্দরবন ভ্রমণ এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে। ফুলে ভরা বনের মাঝে মধু আহরণের দৃশ্য দেখতে এবং খাঁটি সুন্দরবন মধু স্বাদ নিতে এখনই পরিকল্পনা করুন। সুন্দরবনের এই প্রাকৃতিক সম্পদ শুধু মৌয়ালদের জীবিকা নয়, দেশের পর্যটন সম্পদ হিসেবেও উজ্জ্বল হয়ে উঠুক।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার



