
নিজস্ব প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : পবিত্র রমজান মাস এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল পর্যটন নগরী কক্সবাজারে, তা ঈদের টানা ছুটিতে একেবারে কেটে গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক সমুদ্রসৈকতে ছুটে এসেছেন, যা পুরো এলাকাকে মুখরিত করে তুলেছে। পর্যটন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২১ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত এক সপ্তাহে ছয় লাখেরও বেশি পর্যটক কক্সবাজার ভ্রমণ করেছেন। এতে পর্যটন খাতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে, যা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে।
ঈদের ছুটির সঙ্গে স্বাধীনতা দিবস এবং সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে এবার মানুষ টানা দীর্ঘ অবকাশ কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকদের ঢল নেমেছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে। লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা এবং কলাতলীসহ পুরো সৈকতজুড়ে ছিল অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি। সাগরতীরে তিল ধারণেরও জায়গা ছিল না। বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ ও শিশুরা সমুদ্রে স্নান করছেন, বালিয়াড়িতে বসে সূর্যাস্তের অপরূপদৃশ্য উপভোগ করছেন এবং সৈকতের সৌন্দর্যে মগ্ন হয়ে আছেন। এই বিপুল ভিড়ে পুরো এলাকা যেন একটি বড় উৎসবের রূপ নিয়েছে।
সৈকতের বিভিন্ন বিনোদনমূলক সেবায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক ও জেট স্কি চালক, ঘোড়ার মালিক এবং কিটকট ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে জমজমাট ছিল শুঁটকি, আচার, পার্লের তৈরি জিনিসপত্র এবং বার্মিজ মার্কেটের দোকানগুলো। পর্যটকদের আগমনে ব্যবসায়ীরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং আশা করছেন ভবিষ্যতে এই ধারা আরও জোরালো হবে।
সৈকতে বিচ বাইক চালক আব্দুল করিম জানান, রমজানের এক মাসের স্থবিরতার পর ঈদের ছুটিতে ব্যবসা আবার পুরোনো রূপ ফিরে পেয়েছে। এখন প্রতিদিন ভালো সংখ্যক পর্যটক আসছেন, ফলে আয়ও বেড়েছে। জেট স্কি চালক রহিম উদ্দিন বলেন, রমজানে প্রায় বসে থাকতেহয়েছিল, কিন্তু এখন পর্যটকদের আগমনে খুব ভালো লাগছে। ব্যবসা মোটামুটি ভালো চলছে, যা তাদের মনোবল বাড়িয়েছে।
ঘোড়ার মালিক কামাল হোসেন জানান, ঈদের পর থেকে আয়-রোজগার অনেক উন্নতি হয়েছে। রোজার সময় যেখানে প্রায় কোনো আয় ছিল না, এখন পরিস্থিতি অনেক ভালো। তিনি আশা করেন সামনে আরও বেশি পর্যটক আসবে। ফটোগ্রাফার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঈদের ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা ব্যাপক বেড়েছে। আগে যেখানে আয় কম ছিল, এখন সারাদিনে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে ছবি তুলে। এতে তাদের ব্যবসা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
লাবণী পয়েন্টের শুঁটকি ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম জানান, ঈদের আগে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার শুঁটকি মজুত করেছিলেন। এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বিক্রি হচ্ছে, যা তাদের জন্য খুবই সন্তোষজনক। আচার ব্যবসায়ী ফরহাদ আলম বলেন, রমজানের আগে দোকানে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মালামাল ছিল। ঈদকে কেন্দ্র করে আরও সাত লাখ টাকার পণ্য সংগ্রহ করে মোট ১২ লাখ টাকার মাল সাজিয়ে রেখেছিলেন। বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার বিক্রি হচ্ছে এবং এই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
টানা ছুটিতে সাগরপাড়ের পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের কক্ষগুলো শতভাগ বুকিং হয়ে গিয়েছিল। রেস্তোরাঁগুলোতেও ছিল উল্লেখযোগ্য ভিড়। হোটেল কক্স-ভিউয়ের রিজারভেশন ম্যানেজার নাজনীন আক্তার বলেন, ঈদ উপলক্ষে টানা প্রায় ১০ দিনের ছুটি ছিল। প্রত্যাশার তুলনায় পুরোপুরি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হলেও অতিথিদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। ছুটি ঈদের কিছুটা আগে শুরু হওয়ায় প্রত্যাশা সামান্য কম পূরণ হয়েছে, তবে সামগ্রিকভাবে সন্তোষজনক।
প্রাসাদ বিচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক সেলিম রেজা জানান, ঈদের পরবর্তী সময়েও ভালো ব্যস্ততা ছিল। তবে ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় শেষের দিকে পর্যটকের সংখ্যা কিছুটা কমতেশুরু করেছে। টানা প্রায় পাঁচ দিন হোটেলের কক্ষ শতভাগ বুকিং ছিল। তিনি আশা করেন এই ধারা আগামী পহেলা বৈশাখ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুসারে, ঈদ, স্বাধীনতা দিবস ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে গত সাত দিনে ছয় লাখের বেশি পর্যটক কক্সবাজারে এসেছেন। এতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট সব খাতে ৬০০ কোটিরও বেশি টাকার ব্যবসা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, সরকার ও বেসরকারিখাতের সমন্বিত উদ্যোগ নিলে ভবিষ্যতে এই খাতে ১০০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
চেম্বারের মুখপাত্র ফাহিম হাসান বলেন, এবার প্রত্যাশিত পর্যটকের আগমন হয়েছে এবং ব্যবসায় স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। আগের সময়ের তুলনায় পর্যটন খাত এখন অনেক বেশি স্থিতিশীল। আবাসন, পরিবহনসহ সব খাতের জন্য এবারের ব্যবসা ইতিবাচক ছিল। সার্ভিস-সংক্রান্ত অভিযোগও আগের তুলনায় কম। তবে ভবিষ্যতে আরওউন্নতির জন্য অবকাঠামোগত ও সেবাভিত্তিক উন্নয়ন জরুরি। তার মতে, সমন্বিত উদ্যোগ নিলে পর্যটন খাতকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। একই সঙ্গে সময়োপযোগী বিনোদনের ব্যবস্থা বাড়ানো দরকার, যাতে পর্যটকদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পায় এবং শিল্পটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়।
এদিকে, সি-সেইফ লাইফ গার্ড সংস্থার তথ্য অনুসারে, গত ছয় দিনে সমুদ্রস্নানে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষকে লাইফগার্ড সেবার আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে ৮০ হাজারের বেশি পর্যটককে সচেতন করা হয়েছে, যা নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়েছে।
সার্বিকভাবে, এবারের ঈদের ছুটি কক্সবাজারের পর্যটন খাতকে নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা আশাবাদী যে, সঠিক পরিকল্পনা ও উন্নয়নের মাধ্যমে এই খাত আরও সমৃদ্ধ হবে। পর্যটকদেরও সচেতনতা বজায় রাখতে হবে যাতে সৈকতের সৌন্দর্য অটুট থাকে এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি মানুষ এখানে আসতে উৎসাহিত হয়। এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে সকল অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল



