
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ত্রিপোলিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. হাবিব উল্লাহ ১৩ এপ্রিল লিবিয়ার বন্দর নগরী মিসরাতায় এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিয়েছেন। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এই বৈঠককে লিবিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ এতে শ্রমিকদের দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দু’পক্ষের মধ্যে সুস্পষ্ট সহযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে।
মিসরাতার মেয়র মাহমুদ আল-সাগুত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মিসরাতা জেনারেল পাবলিক সার্ভিস কোম্পানির চেয়ারম্যান ও জেনারেল ম্যানেজার, লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম বিষয়ক প্রথম সচিব। মেয়র আল-সাগুত্রি মিসরাতাকে লিবিয়ার অন্যতম নিরাপদ শহর হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, পৌরসভা সকল বাসিন্দা—নির্বিশেষে জাতীয়তা—কে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদান করে যাচ্ছে। মেয়র স্বীকার করেন যে, বাংলাদেশি শ্রমিকরা শহরের সেবা খাত, বাণিজ্য এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অত্যন্ত অর্থপূর্ণ অবদান রাখছেন। তিনি আরও জানান, পৌরসভা তাদের অধিকার সুরক্ষায় সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই প্রতিশ্রুতি অটুট থাকবে।
রাষ্ট্রদূত মো. হাবিব উল্লাহ মেয়রকে ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদানের জন্য। তিনি বলেন, এই শ্রমিকরা শুধু নিজেদের পরিবারের ভরণপোষণই করছেন না, বরং লিবিয়ার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। একইসঙ্গে রাষ্ট্রদূত তাদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। বৈঠকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবটি ছিল বৃহত্তর মিসরাতা এলাকায় বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ‘বেতাকা’ নামে একটি আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র জারি করা। এই পরিচয়পত্র শ্রমিকদের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেবে এবং আইনি সুরক্ষা বাড়াবে। দূতাবাস এই প্রকল্প বাস্তবায়নে পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। মেয়র আল-সাগুত্রি প্রস্তাবটি সাদরে গ্রহণ করেন এবং আশ্বাস দেন যে, পৌরসভা একটি মনোনীত কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
বৈঠকে রাষ্ট্রদূত আরও উত্থাপন করেন পাবলিক সার্ভিস কোম্পানির কর্মীদের বেতন, কাজের সময়, চুক্তির শর্তাবলীসহ বিভিন্ন বিষয়। তিনি জোর দেন যে, শ্রমিকদের সঙ্গে চুক্তি যেন স্বচ্ছ ও ন্যায্য হয়। উভয় পক্ষ এই বিষয়ে একমত হয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত করা, কর্মশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা ভবিষ্যতে যোগাযোগ ও সহযোগিতা আরও জোরদার করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। মিসরাতা জেনারেল পাবলিক সার্ভিস কোম্পানির চেয়ারম্যান ও মহাব্যবস্থাপক সভায় জানান, বর্তমানে তাদের প্রতিষ্ঠানে শতাধিক বাংলাদেশি কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। এই কর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন কর্মসম্পাদন ছাড়া কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো প্রায় অসম্ভব।
বৈঠকে সকলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তা হলো, লিবিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে সম্ভাব্য বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের প্রকৃতি, স্থানীয় পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অবহিত করা। এতে শ্রমিকরা যাতে কোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত সমস্যায় না পড়েন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই উদ্যোগ লিবিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের সংখ্যা ও অবদান বিবেচনায় অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার কর্মী লিবিয়ায় যান এবং সেখানকার পুনর্গঠন প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তবে ভাষা, সংস্কৃতি ও স্থানীয় আইনি জটিলতার কারণে অনেক সময় তারা নানা ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হন। এই বৈঠকের ফলে সেই অসুবিধাগুলো কমিয়ে আনার একটি কার্যকর পথ খুলে গেছে।
রাষ্ট্রদূত হাবিব উল্লাহর এই সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ বাংলাদেশ সরকারের অভিবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে নিরন্তর প্রচেষ্টারই প্রতিফলন। লিবিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও আরও গভীর হচ্ছে। মিসরাতার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরীতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র চালু হলে তা অন্যান্য শহরেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া চুক্তি স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রমিকরা আরও ভালো পরিবেশে কাজ করতে পারবেন, যা দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহকেও বাড়িয়ে তুলবে।
সার্বিকভাবে, এই বৈঠক লিবিয়া-বাংলাদেশ সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এটি দু’দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিকে আরও মজবুত করবে। বাংলাদেশ দূতাবাসের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে লিবিয়ায় বসবাসরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং তারা আরও সুসংগঠিতভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন। মিসরাতার এই সফল বৈঠকের ফলাফল শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো লিবিয়াজুড়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য একটি ইতিবাচক মডেল হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়।



