চট্টগ্রামের পাহাড়ে অনুমোদনহীন বহুতল ভবন: পর্যটন ও পরিবেশ বিপর্যয়ের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক।পর্যটন সংবাদ: চট্টগ্রামের পাহাড়ি সৌন্দর্য আর প্রাকৃতিক ভারসাম্য একসময় এ অঞ্চলকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র করে তুলেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নগরের বায়েজিদ বোস্তামী, শেরশাহ, খুলশী ও আকবর শাহ এলাকাসহ বেশ কয়েকটি পাহাড়ি অঞ্চলে সিডিএর (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) অনুমোদন ছাড়া গড়ে ওঠা একাধিক বহুতল ভবন স্থানীয় পরিবেশ ও সম্ভাব্য পর্যটন শিল্পের জন্য ভয়াবহ হুমকির সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকায় পাহাড় কেটে গড়ে তোলা আবাসিক প্রকল্পে এক থেকে তিনতলা পর্যন্ত বেসমেন্টসহ বিশাল বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে। অথচ সিডিএর নিয়ম অনুযায়ী, পাহাড়ি এলাকায় বেসমেন্ট রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এবং নির্ধারিত প্রশস্ততার রাস্তার ভিত্তিতে ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা নির্ধারিত থাকে।

সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) কাজী হাসান বিন শামস পর্যটন সংবাদকে জানান, “হিলি এরিয়াতে কোনো বেসমেন্টের অনুমতি দেওয়া হয় না। খুব বিশেষ ক্ষেত্রে একতলা সেভ বেসমেন্টের অনুমতি দেওয়া হয়, তবে পাহাড়ের কিনারায় বেসমেন্ট নিষিদ্ধ।”

পর্যটনে নেতিবাচক প্রভাব

চট্টগ্রাম তার সবুজ পাহাড় ও প্রকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে থাকে। কিন্তু পাহাড় কেটে তৈরি হওয়া অপরিকল্পিত ভবনগুলো শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, একই সঙ্গে অঞ্চলটির পর্যটন সম্ভাবনাও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। পাহাড়ি অঞ্চলগুলোয় অনিরাপদ স্থাপনা তৈরি হলে সেখানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে, ফলে ভবিষ্যতে পর্যটকরা এসব এলাকা এড়িয়ে চলতে পারেন।

পরিবেশবিদ আলিউর রহমান বলেন, “যে এলাকায় একতলা বেসমেন্ট অনুমোদন রয়েছে, সেখানে কেউ কেউ তিনতলা পর্যন্ত নিচে খনন করছে, আর উপরে অতিরিক্ত তলা তৈরি করছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানি নিঃশেষ হচ্ছে, ভবনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে। এক কথায়, পরিবেশ এবং মানুষের নিরাপত্তা—দুটিই হুমকির মুখে পড়েছে।”

তিনি আরও জানান, নাগরিক সোসাইটিসহ বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে এ ধরনের অবৈধ নির্মাণ বন্ধ করেছে সিডিএ, কিন্তু এর পরেও নজরদারির ঘাটতির কারণে নতুন করে এসব কাজ শুরু হচ্ছে।

কী বলছে পরিবেশ অধিদপ্তর?

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান জানান, “ভবন নির্মাণে সিডিএই প্রধান কর্তৃপক্ষ। আমরা পাহাড় কর্তনের বিষয়টি নজরে এলে সর্বোচ্চ আইনগত ব্যবস্থা নিই। কিন্তু অনুমোদনবিহীন বেসমেন্ট বা অতিরিক্ত ফ্লোর নির্মাণ আমাদের সরাসরি অধিক্ষেত্রে পড়ে না।”

পর্যটন নগরী না মরুভূমি নগরী?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেদ মেসবাহুজ্জামান তার এক গবেষণায় জানিয়েছেন, “এক সময় চট্টগ্রামে ২০০টির বেশি পাহাড় ছিল, যার মধ্যে ১২০টির বেশি ইতোমধ্যেই বিলুপ্ত। বাকি পাহাড়গুলো এভাবে ধ্বংস হতে থাকলে চট্টগ্রাম একদিন মরুভূমিতে পরিণত হবে।”

তিনি বলেন, “পাহাড় শুধু ভূপ্রকৃতি নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা। পাহাড় ধ্বংসের ফলে নগরের তাপমাত্রা বেড়ে যাবে, জলাধার কমে যাবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কাও বাড়বে। এসবের প্রভাব পর্যটন খাতেও সরাসরি পড়বে।”

সচেতনতা ও আইন প্রয়োগ জরুরি

পর্যটনবান্ধব ও নিরাপদ চট্টগ্রাম গড়তে হলে পাহাড় রক্ষা, পরিকল্পিত নির্মাণ এবং যথাযথ পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে এক সময় এই শহর তার পর্যটন সম্ভাবনাই হারাবে।

Read Previous

দর্শনার্থীর ভিড়ে নাজেহাল কর্ফু, সমাধানে বিলাসবহুল ট্যুরিজম

Read Next

নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে বিভ্রান্তি: ইসির ওয়েবসাইটে ‘নৌকা’ উঠানো-নামানো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular