
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: ঢাকায় পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক’ হিসেবে, অথচ শনিবার (২৬ জুলাই) রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে চাঁদাবাজির সময় চার সহযোগীসহ হাতেনাতে ধরা পড়েন আব্দুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান রিয়াদ। তার এই গ্রেপ্তারের পর থেকেই তার নিজ জেলা নোয়াখালীর সেনবাগে শুরু হয়েছে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও আলোচনা।
রিয়াদকে ছাত্র রাজনীতিতে দেখেছেন অনেকেই, কিন্তু তার অতীত ছিল একেবারে ভিন্ন। সেনবাগ উপজেলার নবীপুর ইউনিয়নের নবীপুর বাজার এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান রিয়াদের বাবা ও দাদা ছিলেন রিকশাচালক। পরে তার বাবা দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন। মা নাজমুন নাহার অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন জীবিকা নির্বাহের জন্য।
দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট রিয়াদ স্থানীয় নবীপুর হাই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। এরপর কোম্পানীগঞ্জের সরকারি মুজিব কলেজে ভর্তি হয়ে যুক্ত হন ছাত্রলীগে। দলীয় নেতাদের কাছ থেকে পরিচিতি পেতে তিনি ফুল দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার ছাত্রদলে। ঢাকায় উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার পর জড়িয়ে পড়েন কোটা বিরোধী আন্দোলনে এবং পরে পরিচিতি পান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম মুখ হিসেবে।
কিন্তু সেই আন্দোলনের মুখোশের আড়ালেই ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলেন প্রভাব বিস্তারকারী চাঁদাবাজ চক্র। ঢাকায় বিলাসবহুল গাড়ি, দামি পোশাক আর রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ঘনঘন উপস্থিতি তাকে করে তোলে ক্ষমতাধর। অথচ গ্রামের লোকজন এখনো মনে করতে পারেন, এক সময় সে পায়জামা-পাঞ্জাবি পড়ে স্কুলে যেত, কারো দয়া-খয়রাত না পেলে এক বেলা খাওয়ারও উপায় থাকত না।
নবীপুরে রিয়াদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো ভাঙা ঘরের পাশে এখন উঠছে পাকা দোতলা ভবন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর হঠাৎ করেই রাতারাতি বদলে যায় তার জীবন। রিয়াদের মা নাজমুন নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা না খেয়ে ওকে শহরে পাঠাইছি। এখন শুনি সে নাকি চাঁদাবাজি করছে! এটা আমার ছেলের কাজ হতে পারে না।”
গ্রামের মানুষ বলছেন, রিয়াদের সম্পদে উল্লম্ফন, ঢাকায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ছবি পোস্ট করা, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের সঙ্গেও ছবি ছিল তার ফেসবুকে। এসব দিয়ে সে নিজেকে ‘অনাক্রম্য’ প্রমাণ করতে চেয়েছিল।
নবীপুর হাই স্কুলের সাবেক সভাপতি শিহাব উদ্দিন বলেন, “এই ছেলেটা দারিদ্র্যের কারণে শিক্ষার খরচ চালাতে পারত না, আমরা এলাকার লোকজন সাহায্য করতাম। এখন শুনি সে চাঁদাবাজ! এটা ভেবে কষ্ট হয়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন আরও অনেক ‘রিয়াদ’ এখনো সমাজে লুকিয়ে রয়েছে যারা রাজনীতি ও আন্দোলনের মুখোশ পরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। তারা প্রশাসনের কাছে এসব মুখোশধারীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
রিয়াদের ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, ‘সমন্বয়ক’ কিংবা ‘আন্দোলনকারী’ পরিচয়ের আড়ালে কত সহজেই ক্ষমতা, অর্থ ও দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলা যায়। এই ঘটনার পর ছাত্র রাজনীতি ও সামাজিক আন্দোলনের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের।
– পর্যটন সংবাদ



