১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ক্যারিবীয় দ্বীপে বাড়ি কিনলেই নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট! ধনীদের নতুন গন্তব্য অ্যান্টিগা ও তার আশপাশ

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে বাড়ি কেনা এখন আর শুধু সমুদ্রতীরবর্তী নিরিবিলি জীবনযাপনের স্বপ্ন নয়—সঙ্গে মিলছে নাগরিকত্ব ও দ্বিতীয় পাসপোর্ট, যা বিশ্বব্যাপী ধনীদের জন্য হয়ে উঠেছে এক নতুন নিরাপত্তা পরিকল্পনা।

বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশের বিত্তবানরা এখন ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট’ (CBI) কর্মসূচির দিকে ঝুঁকছেন। এই কর্মসূচির আওতায় অ্যান্টিগা ও বার্বুডা, ডোমিনিকা, গ্রেনাডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস এবং সেন্ট লুসিয়া—এই পাঁচটি পূর্ব ক্যারিবীয় দ্বীপ দেশ নাগরিকত্বের বিনিময়ে বিনিয়োগের সুযোগ দিচ্ছে।

মাত্র ২ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করলেই মিলছে ঐ দেশের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট, যা দিয়ে ১৫০টিরও বেশি দেশে ভিসা ছাড়াই ভ্রমণ করা যায়, যার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের শেংগেন অঞ্চল।

মার্কিন ধনীদের নজর এখন অ্যান্টিগায়

অ্যান্টিগার স্থানীয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী নাদিয়া ডাইসন জানান, বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ির ক্রেতাই নাগরিকত্ব পাওয়ার উদ্দেশ্যে আসছেন, যাদের বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্র থেকে। একসময় যারা কেবল ছুটির দিনে সমুদ্রের ধারে থাকার বাসনা নিয়ে আসতেন, এখন তারাই বলছেন—“আমাকে নাগরিকত্বসহ একটি বাড়ি দিন।”

বিশ্বব্যাপী অভিবাসন ও বিনিয়োগ পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনারসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট কর্মসূচিতে আগ্রহ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইউক্রেন, তুরস্ক, চীন এবং নাইজেরিয়ার ধনীরাও এই কর্মসূচির প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

দ্বিতীয় পাসপোর্ট মানেই বিকল্প নিরাপত্তা

হেনলি অ্যান্ড পার্টনারসের ডমিনিক ভোলেক বলেন, “ধনীরা দ্বিতীয় পাসপোর্টকে এখন একটি ‘ব্যাকআপ প্ল্যান’ হিসেবে দেখছেন। কেউ কেউ সেসব দেশে বসবাস করেন না, বরং তা রাখেন ভবিষ্যতের সঙ্কট মোকাবেলার জন্য।”

বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় ভ্রমণ বিধিনিষেধ এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী উত্তেজনা অনেক ধনী ব্যক্তিকে এই বিকল্প নাগরিকত্বের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়।

সমালোচনার মুখে নাগরিকত্ব বিক্রির পদ্ধতি

তবে এই নাগরিকত্ব বিক্রির পদ্ধতি নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডিনসের প্রধানমন্ত্রী রালফ গনসালভেস বলেন, “নাগরিকত্ব বিক্রি করা কোনো জাতির জন্য মর্যাদাপূর্ণ কাজ নয়।”

অন্যদিকে ডোমিনিকার প্রধানমন্ত্রী রুজভেল্ট স্কেরিট এই কর্মসূচিকে বৈধ ও স্বচ্ছ বলেই দাবি করছেন। তিনি জানান, “এই কর্মসূচি থেকে আমাদের দেশে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়েছে, যা স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও জরুরি খাতে ব্যবহার করা হয়েছে।”

আন্তর্জাতিক চাপ ও নিরাপত্তার কড়াকড়ি

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে দ্বীপ দেশগুলোর নাগরিকদের ভিসা-মুক্ত প্রবেশাধিকার বাতিলের হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও এই কর্মসূচিকে কর ফাঁকি ও অর্থপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ পথ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্কবার্তা দিয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় ক্যারিবীয় দেশগুলো এখন একটি আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এতে থাকবে কঠোর নিরাপত্তা যাচাই, বাধ্যতামূলক সাক্ষাৎকার, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং অনুমোদনের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতিমালা।

অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা

এই কর্মসূচির ফলে দ্বীপ দেশগুলোর অর্থনীতিতে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এটি বর্তমানে অনেক দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখছে।

কানাডার নাগরিক রবার্ট টেলর সম্প্রতি অ্যান্টিগায় ২ লাখ ডলারে বাড়ি কিনে নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তিনি বলেন, “এই পাসপোর্ট শুধু বসবাসের স্বাধীনতাই দেয়নি, বরং আমার ব্যবসার জন্যও নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।”

বিশ্ব যখন বৈচিত্র্যময় চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন দ্বিতীয় পাসপোর্ট অনেকের জন্য হয়ে উঠছে নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতীক। ক্যারিবীয় দ্বীপগুলোর নাগরিকত্ব বিনিয়িময় কর্মসূচি তাই শুধু বিলাসিতা নয়, হয়ে উঠেছে কৌশলগত সিদ্ধান্ত—বিশেষ করে ধনীদের জন্য।

Read Previous

ঢাকায় বিলাসী জীবন, গ্রামে হতদরিদ্র অতীত—‘সমন্বয়ক’ রিয়াদের চাঁদাবাজির গল্পে তোলপাড় নোয়াখালী

Read Next

সিটি ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান হলেন হোসেন খালেদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular