১৮/০৫/২০২৬
৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাহাকার করছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার: হোটেল-মোটেলে ৫০-৬০% ছাড়েও মিলছে না পর্যটক

নিজস্ব প্রতিনিধি। পর্যটন সংবাদ : বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার এখন পর্যটকশূন্যতায় হাহাকার করছে। তীব্র গরম, ঘনঘন লোডশেডিং এবং জ্বালানি সংকটের কারণে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও পর্যটক আসছে না। সৈকতের পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চেয়ার-ছাতা সাজানো থাকলেও দর্শনার্থীর সংখ্যা নগণ্য। সৈকতকেন্দ্রিক তিন হাজারের বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থবির হয়ে পড়েছে। হোটেলের রুম খালি, ঘোড়া অলস, জেটস্কি চালকেরা অপেক্ষায়, আর দোকানিরা লোকসান গুনছেন।

সম্প্রতি কক্সবাজারে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে পর্যটন খাতে বড় ধস নেমেছে। অনেক হোটেলে দিনে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন ১০০-১৫০ লিটারের বেশি ডিজেল খরচ হচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত আর্থিক চাপে ফেলেছে। ফলে অনেক পর্যটক এক-দুই দিন থেকেই চেকআউট করে চলে যাচ্ছেন।

ঢাকার মতিঝিল থেকে আসা পর্যটক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, “আমরা অবসর উপভোগ করতে এসেছি। কিন্তু ঘনঘন লোডশেডিং পুরো মুড নষ্ট করে দিচ্ছে। ঢাকায় জেনারেটর ব্যাকআপ থাকে, এখানে সময়মতো চালু হয় না।” সাভারের রিয়াজুল কবির জানান, “৮ ঘণ্টার মধ্যে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। গরমে ভোগান্তি অসহ্য। ইনানী থেকে শহরে এসেও একই অবস্থা। একদিনেই চলে যাচ্ছি।” বনানীর নয়ন চৌধুরী বলেন, “তিন দিনের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু ভোগান্তিতে একদিনেই ছাড়তে বাধ্য হচ্ছি।”

হোটেল প্রসাদ প্যারাডাইসের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকর্তা মেহেদী জানান, “প্রতি ঘণ্টায় ২০ লিটার তেল লাগে। দৈনিক ১৪০-১৫০ লিটারের বেশি খরচ হচ্ছে। লোডশেডিং বেড়েছে অনেক।” হোটেল ওশ্যান প্যারাডাইসের ম্যানেজার আব্দুল হান্নান বলেন, “৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দিয়েও পর্যটক ধরে রাখা যাচ্ছে না। অনেকে পরিকল্পনা বদলে আগেভাগে চলে যাচ্ছেন।”

কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, “সব হোটেলে জেনারেটর দিয়ে এসি চালানো সম্ভব নয়। ফুয়েল সংকট ও দাম বৃদ্ধিতে আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে। পর্যটন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে, কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ কম।” কক্সবাজার বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গণি জানান, “হোটেল জোনে ৫০ মেগাওয়াট প্রয়োজন, কিন্তু ৩০-৪৫ মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে। ঘাটতির কারণে লোড ম্যানেজমেন্ট করতে হচ্ছে।”

লাবণী পয়েন্টের ছাতা মার্কেটের ব্যবসায়ী মো. মোরশেদের ভাষায়, “আগে দিনে ৫০-৬০ হাজার টাকার বিক্রি হতো, এখন ১০ হাজারেও নামেনি। সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ না থাকায় বিক্রি একেবারে ধসে গেছে।” সৈকত এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, ইজিবাইক চালক, ঘোড়ার মালিক ও ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফাররা সবাই একই দুঃখে ভুগছেন। অনেক দোকান বন্ধ বা সীমিত সময় খোলা।

অতীতের স্মৃতি ও বর্তমান বাস্তবতা
কক্সবাজারের পর্যটন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঈদ, পূজা বা শীতকালীন মৌসুমে হোটেলগুলোতে ৮০-৯৫% অকুপেন্সি দেখা যায় এবং কয়েক দিনে শত কোটি টাকার ব্যবসা হয়। কিন্তু রমজান বা গরমের সময় স্বাভাবিকভাবেই পর্যটক কমে। এবার লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট তা আরও তীব্র করেছে।

কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, “রমজানে কর্মচারীদের ছুটি দেওয়া হয়। এবারও অনেককে অগ্রিম বেতন দিয়ে ছুটি দেওয়া হয়েছে। ঈদের পর আশা করছি ভিড় বাড়বে।” কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই আশা দূরের মনে হচ্ছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। হোটেলগুলোতে শুধু জেনারেটরের খরচই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অনেক ছোট-মাঝারি হোটেল টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। স্থানীয় অর্থনীতি, যা মূলত পর্যটননির্ভর, চরম সংকটে। রেস্তোরাঁ, ট্যুর অপারেটর, ট্রান্সপোর্ট এবং হস্তশিল্পের দোকানগুলোও একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।

সম্ভাব্য কারণ ও সমাধানের আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তীব্র গরমের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকট, জ্বালানি ঘাটতি এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে। আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্যও নিরাপত্তা, সেবার মান ও স্থিতিশীলতা জরুরি।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন— পর্যটন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানি সংকট সমাধান এবং প্রচারণা জোরদার করা। দীর্ঘমেয়াদে সাসটেইনেবল ট্যুরিজমের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা এবং বছরজুড়ে আকর্ষণীয় প্যাকেজ তৈরি করা প্রয়োজন।

কক্সবাজারের পর্যটন খাত শুধু স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, দেশের রাজস্ব ও কর্মসংস্থানেরও বড় উৎস। বর্তমান সংকট দ্রুত কাটিয়ে না উঠলে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে আরও আকর্ষণীয় ছাড়, উন্নত সেবা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি।

এখন সৈকতে শুধু ঢেউয়ের শব্দ আর খালি চেয়ার-ছাতা। পর্যটন নগরী কক্সবাজার তার হারানো জৌলুষ ফিরে পাবে কবে? সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ হাহাকার থামবে না।

প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল

Read Previous

পর্যটক শূন্য কক্সবাজারের নীরবতার আড়ালে: অবৈধ কারবারের অবাধ বিস্তার

Read Next

বাংলাদেশ-নেপাল সম্পর্ক জোরদারে বিমান যোগাযোগ ও পর্যটন সহযোগিতার ওপর জোর মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular