
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ :
বাংলাদেশ প্রকৃতির অপরূপ উপহারে সমৃদ্ধ একটি দেশ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, রহস্যময় সুন্দরবন, সিলেটের সবুজ চা-বাগান, পার্বত্য চট্টগ্রামের মনোরম পাহাড়ি দৃশ্য, অসংখ্য নদী ও জলাভূমি—এসব কিছু মিলিয়ে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে এখানে। অথচ এই বিপুল সম্পদ সত্ত্বেও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে পর্যটন খাত জিডিপিতে মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি অবদান রাখছে, যেখানে বিশ্ব গড় প্রায় ১০ শতাংশ। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন ছিল প্রায় ৬.৩ লাখ, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। এই সংকটের মূলে রয়েছে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, নীতিগত অস্থিরতা ও অপর্যাপ্ত প্রচারণা।
বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অবকাঠামো অন্যতম। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম—দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে নিচে। প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল-রিসোর্টের অভাব, সড়ক-রেল যোগাযোগের দুর্বলতা, বিমানবন্দর সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যুৎ-পানি সরবরাহের অস্থিরতা পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে নেতিবাচক করে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে দ্বিধায় পড়েন।
নিরাপত্তা উদ্বেগ আরেকটি বড় বাধা। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিদেশি মিডিয়ায় নেতিবাচক চিত্র বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যকে প্রভাবিত করেছে। ভিসা প্রক্রিয়ার জটিলতা, লাভের অর্থ দেশে ফেরত পাঠানোর (রেপ্যাট্রিয়েশন) অসুবিধা, দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।
এছাড়া দক্ষ জনবলের অভাব, প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইডের স্বল্পতা, বৈচিত্র্যহীন পর্যটন পণ্য এবং গবেষণা-ভিত্তিক পরিকল্পনার ঘাটতি খাতটির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা কম থাকায় টেকসই উন্নয়নও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
এসব সত্ত্বেও সরকারের কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ দৃশ্যমান। সাম্প্রতিক সময়ে ‘টুরিজম মেগা প্ল্যান (২০২৬-২০৪০)’ প্রণয়নের কাজ এগিয়েছে। এতে ২০৪০ সাল নাগাদ ৫.৫৭ কোটি পর্যটক আকর্ষণ এবং ২.১৯ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জিডিপিতে পর্যটনের অবদান ৬-৭ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে অবকাঠামো উন্নয়ন, ইকো-টুরিজম, কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন এবং টুরিজম ক্লাস্টার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাবরাংয়ে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোনসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে।
তবে এই উদ্যোগগুলোকে কার্যকর করতে আরও বাস্তবমুখী ও জোরালো পদক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারের উচিত প্রথমেই অবকাঠামো উন্নয়নে বড় আকারের বিনিয়োগ করা। পিপিপি মডেলে আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, রিসোর্ট, আধুনিক সড়ক-রেল যোগাযোগ, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। কক্সবাজার, সিলেট, পার্বত্য অঞ্চল, সুন্দরবন ও কুয়াকাটাসহ ১০টি টুরিজম ক্লাস্টারকে অগ্রাধিকার দিয়ে মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন করা উচিত।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, গন্তব্যস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরা ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন, পর্যটকদের জন্য বিশেষ হেল্পলাইন চালু এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও ই-ভিসা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, লাভের অর্থ সহজে রেপ্যাট্রিয়েশন, ট্যাক্স ছাড়, সহজ ঋণ ও ট্যাক্স হলিডের মতো আকর্ষণীয় ইনসেনটিভ প্রদান বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) চালু করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো দরকার।
আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণা জোরদার করতে হবে। ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ক্যাম্পেইনকে আরও শক্তিশালী করে আন্তর্জাতিক ট্যুরিজম ফেয়ারে অংশগ্রহণ বাড়ানো, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং প্রধানমন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সফরে পর্যটন গন্তব্য অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
দক্ষ জনবল তৈরি অপরিহার্য। টুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন, যুবকদের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এবং গাইডদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে হবে। গবেষণা ও তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করে ডেটা-ড্রিভেন নীতি প্রণয়ন করা উচিত।
পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অপরিকল্পিত নির্মাণ রোধ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ক্লাইমেট চেঞ্জ মোকাবিলা এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটনের প্রসার ঘটিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে লাভের অংশীদার করতে হবে। এতে স্থানীয় সমর্থন বাড়বে এবং টেকসইত্ব নিশ্চিত হবে।
ব্যাংকগুলোকে এসএমই লোনের মাধ্যমে ছোট-মাঝারি পর্যটন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনও কার্যকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি সরকার এসব উদ্যোগ দ্রুত, স্বচ্ছ ও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করে, তাহলে পর্যটন খাত শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি নয়, বরং লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে পারবে। বর্তমানে খাতটির সম্ভাবনা অপরিমেয়। সঠিক নীতি, দৃঢ় বাস্তবায়ন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে উজ্জ্বল স্থান করে নিতে পারবে।
এখনই সময় টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব পর্যটন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের। তাহলেই সোনার বাংলার এই অপার সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে।
প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার


