১৮/০৫/২০২৬
৪ঠা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পর্যটক শূন্য কক্সবাজারের নীরবতার আড়ালে: অবৈধ কারবারের অবাধ বিস্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : কক্সবাজার, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের শহর। সাধারণত যেখানে পর্যটকদের ভিড়ে মুখরিত থাকে সমুদ্রের ঢেউ, হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট আর বাজার—সেখানে এখন নীরবতা বিরাজ করছে। পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেক হোটেল বন্ধ, দোকানপাট ফাঁকা। এই শূন্যতা ও নীরবতার সুযোগ নিয়ে চলছে অবৈধ কার্যকলাপের এক অন্ধকার জগত। মাদক চোরাচালান, মানব পাচার, অবৈধ জ্বালানি বাণিজ্য, জমি দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড যেন দেখার কেউ নেই। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি অনুযায়ী অভিযান চলছে, কিন্তু বাস্তবে অনেকাংশে অবৈধ চক্রগুলোর দৌরাত্ম্য অব্যাহত।

সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারের পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য মন্দা দেখা গেছে। ঈদের মতো উৎসবের সময় হাজার হাজার পর্যটক এলেও সাধারণ দিনগুলোতে হোটেল বুকিং ১৫ শতাংশের নিচে নেমে আসে। নির্বাচন, রমজানসহ বিভিন্ন কারণে এই স্লো ডাউন হয়। ফলে সৈকতের দীর্ঘ বালুচর, টেকনাফ-উখিয়ার পাহাড়ি এলাকা ও সমুদ্র উপকূল হয়ে ওঠে অন্ধকারের আশ্রয়স্থল। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে জানান, রাত নামলেই সৈকতে অবাধে মাদক বিক্রি শুরু হয়। ইয়াবা, আইসসহ নানা নেশাজাতীয় দ্রব্যের কারবার চলে নির্বিঘ্নে। পর্যটক কম থাকায় পুলিশি টহলও কমে যায়, যা চোরাচালানকারীদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে।

কক্সবাজারকে অনেকেই ‘ইয়াবার প্রবেশদ্বার’ বলে অভিহিত করেন। মিয়ানমার সীমান্তবর্তী টেকনাফ ও উখিয়া হয়ে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বিজিবি ও কোস্ট গার্ড মাঝে মাঝে বড় বড় চালান জব্দ করে, যেমন কক্সবাজারে রেকর্ড পরিমাণ মাদক ধ্বংসের খবর এসেছে। একবারই ১৩২১ কোটি টাকা মূল্যের মাদক ধ্বংস করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ মোট চোরাচালানের খুব ছোট অংশ মাত্র। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোকে অনেক সময় এই চক্রের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সীমান্তের পাহাড়ি পথ, নাফ নদী ও সমুদ্রপথে চোরাচালান চলে। ‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল’ অঞ্চলের মাধ্যমে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল থেকে মাদক আসে।

শুধু মাদক নয়, মানব পাচারও বেড়েছে। টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযানে পাচারকারী চক্রের সদস্য ও ভিকটিম উদ্ধার হচ্ছে। মালয়েশিয়া-মধ্যপ্রাচ্যের স্বপ্ন দেখিয়ে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় যুবকদের পাচার করা হয়। সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে করে পাঠানো হয়। পর্যটন মন্দার সময় এসব অপরাধ বাড়ে কারণ নজরদারি কম থাকে। স্থানীয় যুবকদের অনেকে অর্থের লোভে এই চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে, পরিবার ভাঙছে।

অবৈধ জ্বালানি চোরাচালানও একটি বড় সমস্যা। কোস্ট গার্ড প্রায়ই শত শত লিটার অবৈধ তেল জব্দ করে। সমুদ্রপথে মিয়ানমার থেকে আসা এই জ্বালানি স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। এছাড়া অবৈধ মাছ ধরা, সামুদ্রিক সম্পদ লুটপাট চলছে। সূক্ষ্ম জাল দিয়ে চিংড়ির পোনা আহরণের কারণে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। পর্যটক না থাকায় এসব কার্যকলাপ আরও সহজ হয়ে উঠেছে।

জমি দখল ও অবৈধ নির্মাণও বড় ইস্যু। সৈকতের বালুচরে অবৈধ দোকান, স্থাপনা উঠছে। সরকারি উচ্ছেদ অভিযান চললেও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে অনেকে ফিরে আসে। রোহিঙ্গা শিবিরের আশপাশে জমির দাম বেড়েছে, অবৈধ দখল বেড়েছে। পর্যটন উন্নয়নের নামে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। বনাঞ্চল কমছে, লবণাক্ততা বাড়ছে, যা স্থানীয় কৃষি ও জীবিকায় প্রভাব ফেলছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হোটেল মালিকরা বলছেন, এই অবৈধ কার্যকলাপ পর্যটনের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। পর্যটকরা মাদকের ভয়ে, নিরাপত্তাহীনতায় আসতে দ্বিধা করছেন। একজন হোটেল মালিক জানান, “পর্যটক এলে অর্থনীতি চাঙ্গা হয়, কিন্তু মন্দায় অপরাধ বাড়ে। এটা একটা দুষ্টচক্র।” যুবসমাজ মাদকের ছোবলে পড়ছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকে অপরাধে জড়াচ্ছে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মাঝে মাঝে বড় অভিযান হয়, মন্ত্রী পর্যায় থেকে কড়া বক্তব্য আসে। কিন্তু স্থায়ী সমাধানের অভাব। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা, পর্যটনের বছরব্যাপী প্রচার—এসব না করলে সমস্যা থেকেই যাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে তথ্য প্রদানে উৎসাহিত করতে হবে।

কক্সবাজারের সৌন্দর্য অপরূপ। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে চলা অন্ধকার কারবার যদি বন্ধ না হয়, তাহলে এই শহর পর্যটনের স্বর্গ থেকে অপরাধের আখড়ায় পরিণত হবে। সরকার, প্রশাসন, স্থানীয় জনগণ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই নীরবতার আড়ালের অবৈধতা দূর করা সম্ভব নয়। পর্যটকদের ফিরিয়ে আনতে শুধু সৈকত নয়, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় কক্সবাজারের এই নীরবতা আরও গভীর হবে, আর অবৈধ চক্রগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতিও ডেকে আনছে। স্থানীয় সংস্কৃতি বাণিজ্যিকীকরণের শিকার হচ্ছে। যুবকরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করছে। পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে অবৈধ নির্মাণ ও সম্পদ লুটপাটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই পর্যটনের জন্য অবৈধতা মুক্ত কক্সবাজার অপরিহার্য।

সরকারি উদ্যোগে সাম্প্রতিককালে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যেমন সৈকতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, মাদকবিরোধী অভিযান। কিন্তু এগুলো যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার—পর্যটন অফ সিজনেও আকর্ষণীয় প্রোগ্রাম, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় মাদক চোরাচালান রোধ। রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান।

কক্সবাজারের এই নীরবতা যেন শুধু পর্যটকের অনুপস্থিতি না হয়, বরং অবৈধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠে। স্থানীয় সাংবাদিক, এনজিও ও নাগরিক সমাজকে আরও সক্রিয় হতে হবে। শুধু খবর প্রকাশ নয়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দরকার। তবেই এই অন্ধকার দূর হবে, কক্সবাজার আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠবে বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে।

প্রতিবেদক : ইসলাম রাইসুল

Read Previous

নভোএয়ার যোগ দিল এটিজেএফবি এয়ারলাইন্স ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে

Read Next

হাহাকার করছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার: হোটেল-মোটেলে ৫০-৬০% ছাড়েও মিলছে না পর্যটক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular