১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেন্ট মার্টিনে পর্যটন নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ: দূষণ অব্যাহত, ১২,৫০০ দ্বীপবাসী অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে পরিবেশ রক্ষার নামে আরোপিত কঠোর পর্যটন বিধিনিষেধ দেড় মাস অতিক্রান্ত হলেও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। উল্টো এই নিষেধাজ্ঞা দ্বীপের প্রায় ১২,৫০০ বাসিন্দাকে চরম অর্থনৈতিক সংকটে ঠেলে দিয়েছে। পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় অর্থনীতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, যখন সৈকত ও রাস্তায় প্লাস্টিক-পলিথিনের স্তূপ এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ অব্যাহত রয়েছে।

সরকার ২০২৪ সাল থেকে সেন্ট মার্টিনে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করে আসছে। বর্তমান নিয়ম অনুসারে, প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২,০০০ দর্শনার্থী দ্বীপে প্রবেশ করতে পারেন এবং শুধুমাত্র ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। নভেম্বরে রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ থাকায় কার্যত কোনো পর্যটক আসেন না। ফলে প্রতি বছর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ৯ মাস দ্বীপ পর্যটকশূন্য থাকে। এই নীতির লক্ষ্য ছিল দ্বীপের ভঙ্গুর প্রবাল প্রাচীর, জীববৈচিত্র্য এবং পরিবেশ রক্ষা করা। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিধিনিষেধ সত্ত্বেও বাস্তবে দূষণ কমেনি।

স্থানীয়রা জানান, দ্বীপে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা নেই। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা বর্জ্য অপসারণের কোনো টেকসই ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সৈকতের বালুতে এবং রাস্তার ধারে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ব্যাগ, খাদ্যের মোড়কসহ নানা ধরনের বর্জ্যের স্তূপ জমে আছে। এছাড়া অনিয়ন্ত্রিত কুটির ও রিসোর্ট নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে, যা কেয়া বনাঞ্চল ধ্বংস করছে। কেয়া গাছ কাটা এবং অবৈধ নির্মাণের ফলে দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্য আরও বিপন্ন হচ্ছে।

পর্যটকদের জন্য চালু করা ভ্রমণ পাস ব্যবস্থাও বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। এই পাস শুধু পর্যটকদের জন্য নয়, ট্যুর অপারেটর, সাংবাদিক, বিনিয়োগকারী এবং এমনকি কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্যও বাধ্যতামূলক। দ্বীপের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া বা ব্যবসায়িক কাজে গেলেও তাদের পর্যটক হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়, যা তাদের নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। এতে স্থানীয়দের দৈনন্দিন চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

দ্বীপের অধিকাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস ছিল পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসা—হোটেল, হোমস্টে, রেস্তোরাঁ, দোকান, নৌকা চালানো ইত্যাদি। নিয়ন্ত্রণের কারণে এ মৌসুমে স্থানীয় মালিকানাধীন অর্ধেকেরও বেশি হোটেল-হোমস্টে খালি পড়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রে ঢাকা-ভিত্তিক বড় বিনিয়োগকারীদের রিসোর্টগুলো আগে থেকেই বুকিং পেয়েছে, কিন্তু স্থানীয় উদ্যোক্তারা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত। ঐতিহ্যগতভাবে দুই মাসের পর্যটন মৌসুমের আয় দিয়ে বাকি ১০ মাস চলে আসা পরিবারগুলো এখন বাজারের উচ্চমূল্যে জীবনযাত্রা চালাতে পারছে না। অনেকে বেঁচে থাকার জন্য জমি, বাড়ি বা গয়না বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি মৌলিক পরিষেবার ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে। দ্বীপে পর্যাপ্ত শিক্ষক, কলেজ বা পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্র নেই। শিক্ষার্থীদের টেকনাফে গিয়ে অতিরিক্ত আবাসন ও খাবারের খরচ বহন করতে হয়, যা অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে। স্বাস্থ্যসেবা অবস্থা আরও শোচনীয়। ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসকের অভাবে সেটি অকার্যকর। আয় কমে যাওয়ায় অনেকে কক্সবাজার বা টেকনাফে চিকিৎসা নিতে যেতে পারছেন না।

নুনিয়ারছড়া ঘাটে পর্যটকদের অপেক্ষার দুর্ভোগও অমানবিক। জাহাজের সময়সূচী বাকখালী নদীর জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে। আশ্রয়, বিশ্রামাগার, পাবলিক টয়লেট বা শিশুদের জন্য কোনো সুবিধা নেই। শীতকালে নারী, শিশু ও বয়স্করা ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে অপেক্ষা করেন।

দ্বীপবাসীরা সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটনের দাবি জানিয়েছেন। তারা বিকল্প কর্মসংস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, সমুদ্র অ্যাম্বুলেন্স, খাদ্য গুদাম, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং দুর্যোগ আশ্রয়ের দাবি তুলেছেন। স্থানীয় প্রতিনিধিরা বলছেন, “পর্যটন সীমাবদ্ধতা একতরফাভাবে আরোপ করা উচিত নয়। দ্বীপের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করতে হবে।”

বাসিন্দাদের মতে, জীবিকা নির্বাহ সীমিত করার আগে সরকারের উচিত ছিল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ এবং মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করা। তারা জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক বিকল্প ও মৌলিক পরিষেবা ছাড়া কোনো সংরক্ষণ প্রচেষ্টাই সফল হতে পারে না। সেন্ট মার্টিনের এই সংকট শুধু পরিবেশ রক্ষার নয়, বরং স্থানীয় সম্প্রদায়ের টেকসই জীবনযাত্রার প্রশ্নও বটে।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

হ্যানয়ে ঘোড়ার চন্দ্র নববর্ষ: পর্যটনের উত্তাল ঢেউ ধরতে হোটেলগুলোর প্রচারণা ও প্রস্তুতি

Read Next

প্রবাসী ভোটারদের কাছ থেকে ৪.২৩ লাখ পোস্টাল ব্যালট পেল নির্বাচন কমিশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular