১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটন সংকট: মৌসুমী মন্দা ও অর্থনৈতিক ধস

সেন্টমার্টিন দ্বীপ

সেন্টমাার্টন দ্বীপ, ফাইল ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : সেন্টমার্টিন দ্বীপ, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র, যা তার নির্মল সমুদ্রতট, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু চলতি পর্যটন মৌসুমে এখানে প্রত্যাশিত সংখ্যক পর্যটক না আসায় স্থানীয় অর্থনীতিতে গভীর সংকট দেখা দিয়েছে। দ্বীপের অধিকাংশ বাসিন্দা পর্যটন-নির্ভর ব্যবসায় জড়িত, যেমন হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, ভ্যান চালক, ডাব এবং চা বিক্রেতা, শ্রমিক, মাছ ও শুঁটকি ব্যবসায়ী। এই সংকটের ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে, এবং অনেকে আর্থিক দুর্দশায় ভুগছেন। স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা যায় যে, পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে সরকারের নতুন বিধিনিষেধের কারণে এবার মাত্র দুই মাসের জন্য পর্যটকদের রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও, বাস্তবে সেই সংখ্যা অনেক কম ছিল। ফলে, পুরো মৌসুম জুড়ে ব্যবসায়ীদের আশানুরূপ আয় হয়নি, এবং অর্থনৈতিক কার্যকলাপে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

এই পর্যটন মন্দার পিছনে কয়েকটি মূল কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, যাতায়াত ব্যবস্থার পরিবর্তন একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। আগের বছরগুলোতে পর্যটকরা ইনানী বা টেকনাফের দমদমিয়া জেটিঘাট থেকে স্বল্প সময়ে পর্যটকবাহী জাহাজে সেন্টমার্টিন পৌঁছাতেন। কিন্তু বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া জেটিঘাট থেকে জাহাজ চলাচল করছে। এতে যাত্রা সময় অনেক বেড়ে গেছে, এবং অনেক পর্যটক সাগরে দীর্ঘক্ষণ থাকার ভোগান্তির কারণে আগ্রহ হারিয়েছেন। বিশেষ করে বাচ্চা এবং বয়স্কদের জন্য এই যাত্রা অসুবিধাজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়রা মনে করেন যে, এই যাতায়াতের অসুবিধা পর্যটক কমার অন্যতম প্রধান কারণ। উপরন্তু, পরিবেশ সংরক্ষণের নামে কঠোর নিয়মাবলী প্রয়োগ করা হয়েছে, যা দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করলেও স্থানীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দ্বীপবাসীরা বলছেন যে, জানুয়ারি মাসের পর পর্যটক চলাচল বন্ধ হলে তাদের জীবিকা সংকট আরও গভীর হবে। তারা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন যে, পরিবেশ সংরক্ষণের সাথে সাথে বাস্তবভিত্তিক এবং মানবিক পর্যটন নীতি প্রণয়ন করা হোক, যাতে স্থানীয়দের স্বার্থ রক্ষা হয়।

দ্বীপের একটি খাবার হোটেলের মালিক আব্দুল কাদির বলেন, “আগের মৌসুমগুলোতে আমাদের হোটেলে সারাদিন রান্না চলত, এবং গ্রাহকের ভিড়ে ব্যস্ততা থাকত। কিন্তু এবার পর্যটকের সংখ্যা এত কম যে, খাবারের অর্ডার অনেক কমে গেছে। ফলে, কর্মচারীদের বেতন দেওয়া, দোকানের ভাড়া তোলা সবকিছু কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অনেক সময় দোকান চালু রাখাই অসম্ভব মনে হয়। আমরা শুধু আশা করছি যে, পরিস্থিতি উন্নতি হবে, না হলে আমাদের পরিবারগুলোকে বড় সংকটে পড়তে হবে।” এই মতামত অনেক স্থানীয় ব্যবসায়ীর প্রতিফলন। পর্যটন মৌসুম সাধারণত দ্বীপের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, যা স্থানীয়দের আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু এবারের মন্দা সেই চক্রকে ভেঙে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, শুঁটকি ব্যবসায়ীরা, যারা দ্বীপের একটি ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা করেন, তারা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। একজন শুঁটকি দোকানদার রফিকুল হক বলেন, “আগের মৌসুমে দিনে শতাধিক কেজি শুঁটকি বিক্রি হতো, যা আমাদের আয়ের মূল ভিত্তি ছিল। কিন্তু এবার পর্যটক কম থাকায় বিক্রি এতটাই কমে গেছে যে, দৈনন্দিন খরচ মেটানোই মুশকিল। কর্মচারীদের পারিশ্রমিক, মাছ সংগ্রহের খরচ, দোকানের রক্ষণাবেক্ষণ সবকিছু এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা ছোট ব্যবসায়ী হিসেবে শুধু চাই যে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো হোক, যাতে আমাদের জীবিকা সচল থাকে এবং দ্বীপের পর্যটন শিল্প এগিয়ে যায়।” তিনি আরও যোগ করেন যে, আর কয়েকদিন পর দ্বীপে পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে যাবে, এবং বিগত সময়ের তুলনায় এ মৌসুমে কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যবসা হয়নি।

এই সংকটের আরেকটি দিক হলো, দ্বীপের বাইরের কিছু বড় হোটেল এবং রিসোর্ট মালিকদের প্রভাব। অভিযোগ রয়েছে যে, ঢাকা-ভিত্তিক কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান আগে থেকেই পর্যটকদের সাথে যোগাযোগ করে জাহাজ ভাড়া, আবাসন এবং অন্যান্য সুবিধা সহ প্যাকেজ অফার করে পর্যটক পাঠিয়েছেন। এতে তারা তুলনামূলকভাবে লাভবান হলেও, স্থানীয় হোটেল এবং রেস্তোরাঁ মালিকরা তেমন সুবিধা পাননি। ফলে, অর্থনৈতিক অসমতা আরও বেড়েছে। সেন্টমার্টিন হোটেল রিসোর্ট ওনার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রাহিমুল হক বলেন, “বিগত বছরগুলোতে সেন্টমার্টিনে পুরো মৌসুম জুড়ে পর্যটকের স্বাভাবিক আগমন ছিল, কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাত্র দুই মাসের অনুমতির কারণে অনেক হোটেল এবং রিসোর্টকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হবে। অনেকে কর্মচারীদের বেতন এবং দৈনন্দিন ব্যয় কোনোরকমে মেটাতে পারবেন। এই পর্যটক ঘাটতির ফলে দ্বীপের পর্যটন-নির্ভর ব্যবসা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমরা চাই যে, সরকার এই বিষয়ে আরও সহানুভূতিশীল হোক এবং স্থানীয়দের অংশগ্রহণে নতুন নীতি গড়ে তোলা হোক।”

দ্বীপের অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও একই রকম অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, ডাব বিক্রেতারা, যারা সেন্টমার্টিনের সমুদ্রতটে একটি সাধারণ দৃশ্য, তারা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। একজন ডাব বিক্রেতা রহমত উল্লাহ বলেন, “আগে পুরো মৌসুম জুড়ে প্রচুর পর্যটক আসত, এবং দিনে শতাধিক ডাব বিক্রি হতো। কিন্তু এবার মাত্র দুই মাসের সুযোগ ছিল, এবং এখন সারাদিন বসে থেকেও ১০-১৫টা ডাব বিক্রি করতে পারছি না। ডাব কিনে আনা, পরিবহন খরচ সব মিলিয়ে আয় তো দূরের কথা, খরচই ঠিকমতো উঠছে না। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। আমরা শুধু চাই যে, পর্যটন মৌসুম লম্বা করা হোক এবং যাতায়াত সহজ হোক।” এই মতামতগুলো দেখিয়ে দেয় যে, সংকট শুধু বড় ব্যবসায়ীদের নয়, ছোট বিক্রেতাদেরও।

জেটিঘাটের শ্রমিকরাও এই মন্দার শিকার। তারা জাহাজ থেকে মালপত্র নামানো, পর্যটকদের সাহায্য করা ইত্যাদি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। একজন শ্রমিক সেলিম খান বলেন, “আগে প্রতিদিন জাহাজ এলে কাজের চাপ থাকত, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটত। তখন যা আয় হতো, তা দিয়ে পরিবার চালানো যেত। কিন্তু এখন পর্যটক কম আসায় জাহাজও কম আসে, কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক দিন কোনো আয়ই হয় না। সংসারের খরচ চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।” এই শ্রমিকরা দ্বীপের অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, এবং তাদের সংকট পুরো সমাজকে প্রভাবিত করছে।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান বলেন, “পর্যটক কম হওয়ায় দ্বীপের মানুষের আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আমরা চাই পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থও বিবেচনায় নেওয়া হোক। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করা এবং স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুললে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।” তিনি আরও যোগ করেন যে, স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো দরকার।

পর্যটকদের দিক থেকেও যাতায়াতের ভোগান্তি একটি বড় অভিযোগ। ঢাকার একজন পর্যটক আহমেদ রহমান বলেন, “নুনিয়ারছড়া জেটিঘাট থেকে জাহাজে দীর্ঘ সময় থাকতে হয়েছে। সাগরে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটানো অনেকের জন্য কষ্টকর। এক্ষেত্রে ছোট বাচ্চা ও বয়স্কদের বেশি ভোগান্তিতে পোহাতে হয়। যদি যাতায়াত সহজ হতো, তাহলে আরও অনেকে আসতেন।”

এসব বিষয়ে টেকনাফ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য পর্যটক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। আমরা দ্বীপবাসীর কষ্ট বুঝি, তবে স্থানীয় জনগণের জীবিকা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে বিকল্প ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে কাজ করছি।” তিনি আশ্বাস দেন যে, ভবিষ্যতে আরও ভালো ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সামগ্রিকভাবে, সেন্টমার্টিনের এই পর্যটন সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক এবং পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা জরুরি, কিন্তু স্থানীয়দের জীবিকা নিশ্চিত না করে তা সম্ভব নয়। সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে আরও সহযোগিতা এবং নতুন নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে এই সংকট কাটানো যেতে পারে। অন্যথায়, দ্বীপের অর্থনীতি আরও ধস নামতে পারে, এবং স্থানীয়রা অন্যান্য জীবিকার পথ খুঁজতে বাধ্য হবেন। এই মৌসুমের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পর্যটন ব্যবস্থাপনা আরও সুষ্ঠু করা দরকার, যাতে পরিবেশ এবং মানুষ উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হয়।

প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ

Read Previous

ভুয়া নথিতে কানাডা ভিসার চেষ্টা: সিঙ্গাপুর থেকে ফিরল ৬০০ বাংলাদেশির পাসপোর্ট, তদন্তে সিআইডি

Read Next

থাইল্যান্ডের পর্যটন পুনরুজ্জীবন: চন্দ্র নববর্ষে চীনা পর্যটকদের বৃদ্ধির আশা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular