১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রে শাটডাউনের প্রভাবে এক হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল, বিপর্যস্ত বিমান চলাচল ব্যবস্থা

ছবি: সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি শাটডাউন বা প্রশাসনিক অচলাবস্থার কারণে দেশজুড়ে এক হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফেডারেল সরকারের তহবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বেতনবিহীনভাবে কাজ করা বিমান নিয়ন্ত্রক ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের উপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন শুক্রবার এ সিদ্ধান্ত নেয়।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটলান্টা, নিউয়ার্ক, ডেনভার, শিকাগো, হিউস্টন ও লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো প্রধান বিমানবন্দরসহ অন্তত চল্লিশটি বিমানবন্দরে এই ফ্লাইট হ্রাস কার্যকর করা হয়েছে। এর ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিমান পরিবহন নেটওয়ার্কে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে।

শাটডাউনের মূল কারণ

রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ, বিশেষ করে স্বাস্থ্য বীমা ভর্তুকি নিয়ে, বাজেট পাসে অচলাবস্থা তৈরি করেছে। ১ অক্টোবর থেকে তহবিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থা সীমিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি অনেক কর্মচারী বেতন ছাড়াই কাজ করছেন, আবার কেউ বাধ্য হয়ে ছুটিতে আছেন। প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে এই সংকট চলতে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা ও বিলম্ব

ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটঅ্যাওয়্যার জানিয়েছে, শুক্রবারের নির্ধারিত সময়সূচিতে অন্তত এক হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বিমানবন্দর হলো ওয়াশিংটনের রিগ্যান ন্যাশনাল, ডেনভার ইন্টারন্যাশনাল এবং আটলান্টার হার্টসফিল্ড-জ্যাকসন।

ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FAA) জানিয়েছে, রিগ্যান ন্যাশনালে গড়ে চার ঘণ্টা বিলম্ব হচ্ছে, ফিনিক্সে দেড় ঘণ্টা এবং শিকাগো ও সান ফ্রান্সিসকোতে প্রায় এক ঘণ্টা করে বিলম্ব দেখা যাচ্ছে। এতে হাজার হাজার যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে বিপাকে পড়ছেন।

আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সিইও রবার্ট ইসম এই পরিস্থিতিকে “অযৌক্তিক ও হতাশাজনক” বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, রাজনৈতিক অচলাবস্থার বোঝা সাধারণ মানুষ ও ভ্রমণকারীদের কাঁধে চাপানো অন্যায্য।

রাজনৈতিক দোষারোপ

পরিবহন সচিব শন ডাফি এই শাটডাউনের জন্য ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, “যদি তারা এখনই বাজেট চুক্তিতে সম্মত না হন, তবে এটি দেশের জন্য লজ্জাজনক।” ডাফি আরও দাবি করেন, সরকার পুনরায় চালু করতে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার সময় এসেছে।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে কংগ্রেস সদস্যদের আহ্বান জানিয়েছেন—চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা যেন রাজধানী ত্যাগ না করেন। তবে ডেমোক্র্যাটরা জানিয়েছেন, তারা এমন কোনো বাজেট পরিকল্পনায় সই করবেন না যেখানে স্বাস্থ্যসেবা খাতে গুরুতর কাটছাঁটের প্রস্তাব রয়েছে।

এয়ারলাইনগুলোর প্রতিক্রিয়া

আমেরিকান এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত ফ্লাইট হ্রাসের ফলে প্রতিদিন প্রায় ২২০টি ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। ডেল্টা এয়ার লাইনস জানিয়েছে, তারা শুক্রবার প্রায় ১৭০টি ফ্লাইট কমিয়েছে। সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্সও একই দিনে শতাধিক ফ্লাইট বাতিল করেছে বলে সিএনএন জানায়।

ফ্লাইটঅ্যাওয়্যারের তথ্য অনুসারে, বৃহস্পতিবার ৬,৮০০টিরও বেশি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছিল এবং প্রায় ২০০টি বাতিল করা হয়। এতে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা চেকপয়েন্টে লম্বা সারি ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

যাত্রীদের উদ্বেগ

থ্যাঙ্কসগিভিং ছুটির ঠিক আগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যদি সংকট চলতে থাকে, তবে ছুটির মৌসুমের ভ্রমণ পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যেতে পারে। নিউইয়র্কের লাগার্ডিয়া বিমানবন্দরে অপেক্ষারত যাত্রী ওয়ার্নার বুচি বলেন, “যদি পরিস্থিতি থ্যাঙ্কসগিভিং পর্যন্ত টিকে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।”

মেইন থেকে আগত এক যাত্রী রোন্ডা বলেন, “ছুটির সময়টা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, কারণ রাজনীতিবিদরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে না। এতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।”

ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, বিমান চলাচল এখনো নিরাপদ এবং তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে বাস্তবে বিমান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অনেক কর্মী দীর্ঘ সময় ধরে বেতন পাচ্ছেন না, কেউ কেউ বাধ্য হয়ে অন্য কাজ খুঁজছেন।

যদি আগামী সপ্তাহে কংগ্রেস কোনো সমঝোতায় না পৌঁছায়, তবে ফ্লাইট বাতিলের হার বর্তমান চার শতাংশ থেকে বেড়ে দশ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে শুধু বিমান চলাচল নয়, পুরো দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।

সংক্ষেপে বললে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অচলাবস্থা এখন আকাশপথে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। মানুষ কষ্ট পাচ্ছে, ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আর থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের মতো ব্যস্ততম ভ্রমণ মৌসুমের আগে এই অচলাবস্থা কাটানোর বিকল্প নেই—না হলে বিপর্যয় আরও গভীর হবে।

Read Previous

ডায়াবেটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভিসা বাতিলের ঝুঁকি: যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নির্দেশনায় উদ্বেগ

Read Next

বেবিচকের ক্ষমতা সংকোচনের আশঙ্কা: নতুন বিমান আইন সংশোধনে ঝুঁকিতে আন্তর্জাতিক মান ও নিরাপত্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular