১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেবিচকের ক্ষমতা সংকোচনের আশঙ্কা: নতুন বিমান আইন সংশোধনে ঝুঁকিতে আন্তর্জাতিক মান ও নিরাপত্তা

বেবিচক

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সরকার ‘বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ–২০২৫’-এর খসড়া জনমতের জন্য উন্মুক্ত করেছে। কিন্তু এই সংশোধনের প্রস্তাব নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানিয়েছে, প্রস্তাবিত অধ্যাদেশের কিছু ধারা কার্যকর হলে দেশের বিমান নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক মান রক্ষা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

বেবিচকের মূল আপত্তি রয়েছে প্রস্তাবিত আইনের ১৪ ধারার পরিবর্তন নিয়ে। ২০১৭ সালের বিদ্যমান আইনে বেবিচক চেয়ারম্যানকে বিমান নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশ, আদেশ ও বিজ্ঞপ্তি জারি করার স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া আছে। এই ক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) থেকে পাঠানো নতুন নিয়ম বা সংশোধনী প্রস্তাবের সময়সীমা অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু নতুন অধ্যাদেশে রুলস অব বিজনেসের ১৪(ক) অনুচ্ছেদ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে, যেখানে কোনো সময়সীমা নির্ধারিত নেই। অর্থাৎ চেয়ারম্যানকে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষা করতে হবে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি ঘটাবে। বেবিচকের মতে, এতে আইকাও নির্ধারিত সময়সীমা রক্ষা করা সম্ভব হবে না এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মান রক্ষায় পিছিয়ে পড়বে। ফলে আইকাও বাংলাদেশকে “গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগের দেশ” হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে।

বেবিচকের এক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে সংস্থার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাবে। এতে বিমান নিরাপত্তা বিধান তৈরিতে বিলম্ব হবে এবং আন্তর্জাতিক অডিটে বাংলাদেশের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, “প্রযুক্তিগত বা জরুরি সিদ্ধান্তে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হলে দ্রুত বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। আর নিরাপত্তা খাতে বিলম্ব মানেই বড় ঝুঁকি।”

নতুন অধ্যাদেশে ট্রাভেল এজেন্সি সম্পর্কিত একটি ধারা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে বেবিচক। তাদের মতে, ট্রাভেল এজেন্সি আইন, ২০১৩ অনুযায়ী এই খাত ইতোমধ্যেই নিয়ন্ত্রিত। নতুন আইন যুক্ত হলে দ্বৈততা ও আইনি জটিলতা তৈরি হবে। তাই ট্রাভেল এজেন্সি সংক্রান্ত বিধান আগের আইনেই বহাল রাখা উচিত বলে সংস্থাটি মত দিয়েছে।

এছাড়া বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর তদারকি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বেবিচক। বর্তমানে বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো দেশীয় মালিকানাধীন সাধারণ বিক্রয় প্রতিনিধি (জিএসএ) নিয়োগের মাধ্যমে কাজ করে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণে সহায়তা করে। কিন্তু নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদেশি সংস্থাগুলো নিজস্ব অফিস খুলতে পারবে বা একাধিক প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে পারবে। বেবিচকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এতে মনিটরিং দুর্বল হবে এবং ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতে সমস্যা দেখা দেবে।

অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম মনে করেন, তড়িঘড়ি করে আইন পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, “২০১৭ সালের আইন সংসদে পাস হয়েছে এবং এখনো কার্যকর রয়েছে। তাই হঠাৎ সংশোধনের যুক্তি স্পষ্ট নয়। বরং এতে বেবিচকের ক্ষমতা সীমিত হয়ে গেলে তা আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশনের (আইকাও) নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।” তাঁর মতে, “আইকাওর নিয়ম অনুযায়ী একটি রাষ্ট্রের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট স্বাধীনতা দিতে হয়। সেটি সংকুচিত করলে আন্তর্জাতিক অডিটে সমস্যা দেখা দেবে। তাই সংশোধনে তাড়াহুড়ো না করে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা উচিত।”

বেবিচক বলছে, বর্তমান আইনের কাঠামো আন্তর্জাতিক মানে কার্যকরভাবে কাজ করছে। তাই জনস্বার্থে ২০১৭ সালের আইনের ১৪ ধারা অপরিবর্তিত রাখা উচিত। এতে চেয়ারম্যান দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং আইকাওর নিয়ম অনুযায়ী সময়সীমা রক্ষা করা সম্ভব হবে। সংস্থাটি মনে করে, বর্তমান আইনেই বিমান নিরাপত্তা, যাত্রীসেবা এবং প্রযুক্তিগত দিকগুলো আন্তর্জাতিক মানে রক্ষা করা সম্ভব। তাই নতুন অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।

সবশেষে বেবিচক জানিয়েছে, ২০১৭ সালের বিদ্যমান আইন অপরিবর্তিত রেখে বর্তমান কাঠামো বজায় রাখলে দেশের বিমান নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও প্রশাসনিক দক্ষতা বজায় থাকবে। অন্যদিকে, তড়িঘড়ি করে নতুন আইন কার্যকর করা হলে তা বিমান চলাচল খাতের স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক মান রক্ষায় বাংলাদেশ যেন পিছিয়ে না পড়ে, সে বিষয়টি এখন সরকারের গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Read Previous

যুক্তরাষ্ট্রে শাটডাউনের প্রভাবে এক হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল, বিপর্যস্ত বিমান চলাচল ব্যবস্থা

Read Next

দেশে আসছে নতুন বেসরকারি এয়ারলাইন ‘ফ্লাই ঢাকা’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular