
ছবি : পর্যটন সংবাদ
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে বিমান টিকিট বিক্রির বাজারে মিশ্র কিন্তু ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। আইএটিএর বিলিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট প্ল্যানের আওতায় এই সময়ে ট্রাভেল এজেন্টদের মোট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ১৩,৬২৯ কোটি টাকা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের অস্থিরতা এবং ভ্রমণসংক্রান্ত নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বাজারটি বছরওয়ারি ৬.৬৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে।
আইএটিএ-সংযুক্ত ট্রাভেল এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন বিএসপির সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের বিএসপি ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী বিমান সংস্থার সংখ্যা বেড়ে ৪৫টিতে পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ৪২টি। এই বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে পরিচালনগত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিমান সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশি বাজার এখনও আকর্ষণীয়।
ডলার মূল্যে হিসাব করলে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মোট বিক্রি ছিল ১১১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় কার্যত অপরিবর্তিত। ডলারের হিসাবে সামান্য ০.০৪ শতাংশ হ্রাস হলেও স্থানীয় মুদ্রায় বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত টাকার অবমূল্যায়নের প্রতিফলন, যেখানে প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে মুদ্রা পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়েছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে এশিয়া-প্যাসিফিক বিএসপি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ। মোট বিক্রির ২.৩৪ শতাংশ এবং মোট লেনদেনের প্রায় ২.৯৫ শতাংশ এসেছে বাংলাদেশ থেকে। এই সময়ে দেশে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ ৭০ হাজার লেনদেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১.৫১ শতাংশ কম। লেনদেন কমলেও গড় টিকিট মূল্য বাড়ায় মোট বিক্রি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
২০২৫ সালজুড়ে মাসভিত্তিক পারফরম্যান্সে বড় ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। বছরের প্রথমার্ধে বাজার ছিল তুলনামূলক দুর্বল। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে ডলার মূল্যে বিক্রি আগের বছরের তুলনায় ২৬.৮ শতাংশ এবং টাকায় ১৮.৮১ শতাংশ কমে যায়। তবে জুনের পর চিত্র দ্রুত বদলাতে শুরু করে, যখন গ্রীষ্মকালীন ভ্রমণের মৌসুমে চাহিদা বেড়ে যায়।
গ্রীষ্মের শেষভাগে বাজারে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন ঘটে। আগস্ট মাসে সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স দেখা যায়, যখন এক মাসেই প্রায় ১৪ কোটি ৯০ লাখ মার্কিন ডলারের টিকিট বিক্রি হয়। এটি আগের বছরের আগস্টের তুলনায় ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডলার মূল্যে বিক্রি যথাক্রমে ৩৫ শতাংশ, ৫৭ শতাংশ ও ৩৯.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, যা বছরের সামগ্রিক চিত্রকে ইতিবাচক করেছে।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি ছিল বিদেশগামী অবসর ভ্রমণ, প্রবাসী কর্মীদের যাতায়াত এবং আগের সময়ের চাপা চাহিদা। অক্টোবর মাসেও বিক্রি সামান্য বাড়তি ছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে বছরের শেষ প্রান্তিকে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় প্রবেশ করেছে।
তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের এই অসম গতি ভিসা সীমাবদ্ধতা, বিমান ভাড়ার অস্থিরতা, বিভিন্ন রুটে ধারণক্ষমতা সমন্বয় এবং যাত্রীদের ভ্রমণ অভ্যাসে পরিবর্তনের ফল। একই সঙ্গে ইলেকট্রনিক টিকিটিং এখন বাজারে প্রায় একচেটিয়া অবস্থানে, যা মোট লেনদেনের ৮৭ শতাংশের বেশি। রিফান্ড ও বাতিল সংক্রান্ত লেনদেন কমে যাওয়ায় ভ্রমণকারীদের আস্থার উন্নতির ইঙ্গিতও মিলছে।
বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের অন্যতম নগদ-নির্ভর বিএসপি বাজার। প্রায় সব লেনদেনই নগদে নিষ্পত্তি হয়, যা স্থানীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক ঋণ সুবিধার সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে। দেশে আইএটিএ-অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্টের সংখ্যা ১,৪৪৪টি, যা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের মোট বিএসপি এজেন্টের উল্লেখযোগ্য অংশ।
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, সামগ্রিকভাবে তথ্য বলছে বাজার এখন আক্রমণাত্মক সম্প্রসারণের পথে নয়, বরং অবস্থান ধরে রাখার কৌশলে এগোচ্ছে। বিমান সংস্থাগুলো নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন করছে এবং সরকার অবকাঠামো ও নীতিগত সংস্কারে মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকই নির্ধারণ করবে, গ্রীষ্মের শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন বছর শেষে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ নিতে পারে কি না।



