পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা-বাগানের ভেতরে বসে এক ভিন্ন রকমের হাট—মিরতিংগা বাজার। আধুনিকতার ঝলক এখানে নেই, আছে পুরোনো দিনের গন্ধমাখা এক জীবনচিত্র। সপ্তাহে দুই দিন—সোমবার ও বৃহস্পতিবার—বিকেল নামতেই জমে ওঠে এ হাট।
বৃহস্পতিবারের বাজার সবচেয়ে জমজমাট। চা-শ্রমিকরা সেদিন পান সপ্তাহের মজুরি, যা স্থানীয় ভাষায় পরিচিত ‘তলববার’ নামে। হাতে সামান্য হলেও নগদ টাকা থাকে, তাই সেদিনই সেরে নেন সপ্তাহের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা। সোমবারের বাজারকে অনেকে মজা করে বলেন ‘বাকির হাটবার’, কারণ সেদিন অধিকাংশ কেনাকাটাই হয় ধার খাতায়।
হাটের দৃশ্য অন্য রকম। দোচালা টিনের ছাউনি দেওয়া দোকানগুলো সারি সারি বসানো, বেড়া নেই, চারদিক খোলা। আবার কেউ টেবিল বা পলিথিন পেতে পসরা সাজিয়েছেন। মাছ, চাল-ডাল, তেল-নুন, শাকসবজি থেকে শুরু করে গাছের চারা, জুতা, খুন্তি—প্রায় সবকিছুরই জোগান আছে এখানে। শুকনা খাবারের দোকানে মেলে খই, গজা, জিলাপি; গরম পেঁয়াজুর দোকানের সামনে ভিড় জমে থাকে সবসময়।

মিরতিংগা বাজারের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল বাণিজ্যের নয়, এক ধরনের আত্মীয়তার। শ্রীমঙ্গলের গোবিন্দ চরণ ভট্টাচার্য গত ৩০ বছর ধরে এখানে মিষ্টির দোকান বসান। মুন্সিবাজারের আবাস মিয়া বললেন, তাঁর বাবা যেমন এখানে পান-সুপারি বিক্রি করতেন, তিনিও তাই করছেন গত ২৫ বছর ধরে। অনেক ব্যবসায়ীরই গল্প একই—হাটের সঙ্গে তাঁদের পারিবারিক যোগ।
সূর্য ডোবার পর চা-বাগানের ছায়া-টিলায় লালচে আঁচ ছড়িয়ে পড়ে, কুপিবাতি জ্বলে ওঠে দোকানে দোকানে। বিদ্যুতের আলো কোথাও কোথাও থাকলেও কুপির ঝলমল আলোই যেন হাটের প্রাণ। সেই আলোয় তামাটে মুখের শ্রমজীবীরা ব্যাগভর্তি চাল, শাকসবজি কিংবা শুকনা মাছ নিয়ে ঘরে ফেরেন।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাট ফাঁকা হতে থাকে। কিন্তু প্রতিবারের মতোই আবারও প্রতিশ্রুতি রেখে যায়—পরের তলববারে এই মাটির গন্ধমাখা হাট আবার ভরে উঠবে মানুষের কোলাহলে।
ভ্রমণপ্রেমীরা চাইলে ভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্য ঘুরে আসতে পারেন এই প্রাচীন হাট থেকে। এখানে ঘুরে দেখলে চা-বাগানের শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে যাবে শতবর্ষী এক হাটের অদ্ভুত আবহ।



