
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি,পর্যটন সংবাদ: টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক বিশাল, কিন্তু ধ্বংসপ্রায় অট্টালিকা। ভাঙা দেয়াল, আগাছায় ঢেকে যাওয়া বারান্দা, ফাটা করিডর আর ঝাপসা রঙ—সব মিলিয়ে এক নীরব স্মৃতির কণ্ঠস্বর যেন বলে, এখানে একদিন ছিল ঐশ্বর্য, আভিজাত্য আর রাজকীয় আসর। এই স্থাপনাটিই হেমনগর জমিদার বাড়ি।
প্রথম দেখায় পরিত্যক্ত কোনো প্রাচীন ভবন মনে হলেও, কাছে গেলে বোঝা যায়—এটি ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শতাধিক বছর আগে নির্মিত এই প্রাসাদ ছিল উত্তরবঙ্গের জমিদারির গৌরবের প্রতীক।
ইতিহাস অনুযায়ী, পুখুরিয়া পরগণার এক জমিদার যমুনা নদীর ভাঙনে পুরোনো রাজবাড়ি হারানোর পর হেমনগরে নতুন করে নির্মাণ করেন এই বাড়ি। প্রায় ৬০ একর জমিজুড়ে গড়ে ওঠা এই প্রাসাদে ছিল দোতলা ভবন, বড় দরবার হল, অন্দরমহল, অতিথিশালা, পুকুর আর বাগান।
স্থানীয়দের ভাষায়, একসময় এই প্রাসাদের সৌন্দর্য ছিল চোখ ধাঁধানো। দরজায় ফুল-লতার নকশা, ছাদে আয়নার কারুকাজ, দেয়ালে কাঁচের কাজ—সব মিলিয়ে একে অনেকে “পরীর দালান” বলেও ডাকতেন। পূজা-পার্বণ, নাটক, পালাগান আর সামাজিক অনুষ্ঠানে একসময় জমজমাট থাকত পুরো এলাকা।
কিন্তু জমিদার প্রথার অবসান আর সময়ের প্রবাহে হারিয়ে গেছে সেই জৌলুশ। জমিদার পরিবার দেশ ছাড়ার পর বাড়িটি হয়ে পড়ে পরিত্যক্ত। সরকারি সংরক্ষণ না থাকায় ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে স্থাপনাটি। এখন দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ছে, কাঠের দরজা পচে যাচ্ছে, আর ছাদের ফাঁক গলে বৃষ্টি ঢোকে ভেতরে।
তবু এর আকর্ষণ কমেনি। প্রতি সপ্তাহেই আশপাশের জেলা ও রাজধানী থেকে লোকজন আসে ঘুরতে। কেউ ইতিহাস জানতে, কেউবা ভগ্ন প্রাসাদের রহস্যময় সৌন্দর্য দেখতে।
স্থানীয় তরুণরা বলেন, “জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা হলে এখানে পর্যটক বাড়বে, গ্রামের অর্থনীতিও চাঙা হবে। দোকানপাট, খাবারের দোকান, পরিবহন—সবকিছু গড়ে উঠবে।”
পর্যটন বিশ্লেষকরা মনে করেন, যথাযথ সংস্কার ও প্রচারণা চালানো গেলে হেমনগর জমিদার বাড়ি টাঙ্গাইলের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। ঐতিহাসিক গুরুত্ব, স্থাপত্যের নান্দনিকতা এবং চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলিয়ে এটি দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হতে পারে।
১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে এই ভবনে একটি ডিগ্রি কলেজের কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে তা অন্য ভবনে স্থানান্তর হয়েছে। ফলে জমিদার বাড়িটি আবারও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, “এই স্থাপনা শুধু একটি পুরোনো বাড়ি নয়, এটি একটি যুগের দলিল। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে সংরক্ষণ করা গেলে এটি টাঙ্গাইলের পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করবে।”
ভগ্নপ্রায় এই রাজবাড়ি হয়তো তার পুরোনো গৌরব হারিয়েছে, কিন্তু ইতিহাস এখনো দেয়ালের ফাটলে, ছাদের ভাঙনে, কিংবা আগাছার ফাঁকে নিঃশব্দে টিকে আছে। একটু উদ্যোগই পারে হেমনগর জমিদার বাড়িকে আবার জাগিয়ে তুলতে—বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও পর্যটনের মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নাম হিসেবে।



