১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তা প্রহম: প্রকৃতির কোলে হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন মন্দিরের রাজ্য

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: কম্বোডিয়ার সিয়েম রিপ প্রদেশে অবস্থিত তা প্রহম (Ta Prohm) হলো এমন এক মন্দির, যেখানে ইতিহাস আর প্রকৃতি একে অপরকে জড়িয়ে আছে। গাছের শেকড় যেভাবে প্রাচীন পাথরের দেয়ালকে আলিঙ্গন করেছে, তা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। এই অনন্য দৃশ্যের কারণেই হলিউড সিনেমা “Tomb Raider” এখানে শুট করা হয়েছিল, যা মন্দিরটিকে বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত করে তোলে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য

তা প্রহম নির্মিত হয় ১২শ শতকের শেষ দিকে রাজা জয়বর্মণ সপ্তম-এর সময়ে। মন্দিরটি মূলত রাজা তার মায়ের স্মৃতিতে নির্মাণ করেছিলেন। এটি একসময় ছিল একটি বিশাল বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ও মঠ, যেখানে প্রায় ১২,০০০ মানুষ বসবাস করত—ভিক্ষু, শিক্ষক ও ছাত্রদের নিয়ে এটি ছিল আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র।

পরে খেমার সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরটি জঙ্গলে ঢেকে যায়, এবং প্রকৃতি ধীরে ধীরে এর অংশ হয়ে ওঠে।

স্থাপত্য ও সংস্কৃতি

তা প্রহমের স্থাপত্য আঙকোর যুগের অন্যতম উৎকৃষ্ট নিদর্শন। মন্দিরে রয়েছে অসংখ্য গ্যালারি, টাওয়ার, দরজা ও বৌদ্ধ ভাস্কর্য। সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো—বিশাল শেকড়ওয়ালা গাছ (স্পাং ট্রি ও বেনিয়ান ট্রি) যেগুলো পাথরের দেয়াল ভেদ করে বেড়ে উঠেছে।

স্থানীয়রা মন্দিরটিকে “জীবন্ত ইতিহাস” বলে ডাকে, কারণ প্রকৃতি ও স্থাপত্য এখানে একাকার হয়ে গেছে। ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিকরা সিদ্ধান্ত নেন এই মন্দিরটিকে “প্রাকৃতিক অবস্থায়” রেখে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে দর্শনার্থীরা প্রকৃতির সঙ্গে ইতিহাসের এই অনন্য সংলাপ দেখতে পারেন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

তা প্রহমে প্রবেশ করলেই এক ধরনের রহস্যময় শান্তি অনুভব হয়। গাছের ছায়া, ভাঙা ভাস্কর্য, আর পাখির ডাক মিলে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। সূর্যের আলো যখন গাছের ফাঁক দিয়ে মন্দিরের দেয়ালে পড়ে, তখন মনে হয় সময় যেন থেমে গেছে।

প্রবেশমূল্য

তা প্রহমও আঙকোর আর্কিওলজিকাল পার্ক-এর অংশ, তাই আলাদা টিকিট লাগে না।

  • ১ দিনের পাস: ৩৭ মার্কিন ডলার
  • ৩ দিনের পাস: ৬২ মার্কিন ডলার
  • ৭ দিনের পাস: ৭২ মার্কিন ডলার
    বাংলাদেশি টাকায় আনুমানিক ৪,০০০–৮,০০০ টাকার মধ্যে।
    ১২ বছরের নিচে শিশুদের জন্য ফি নেই।

যাতায়াত ব্যবস্থা

  • ঢাকা থেকে সিয়েম রিপ: সরাসরি ফ্লাইট নেই; ব্যাংকক, কুয়ালালামপুর বা সিঙ্গাপুর হয়ে যেতে হয়।
  • সিয়েম রিপ শহর থেকে তা প্রহম: দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার।
    • টুকটুক ভাড়া: অর্ধদিনের জন্য ৮–১০ ডলার, পূর্ণ দিনের জন্য ১৫–২০ ডলার।
    • সাইকেল ভাড়া: দিনে ২–৪ ডলার।
    • মোটরবাইক ভাড়া: দিনে ৮–১২ ডলার।
      মন্দির ঘোরার সময় সকালে শুরু করাই ভালো, কারণ দুপুরের পর গরম পড়ে।

থাকার ব্যবস্থা

তা প্রহমের কাছে সরাসরি থাকার জায়গা নেই, তবে সিয়েম রিপ শহরেই সব ধরণের থাকার সুযোগ আছে।

  • বাজেট হোটেল: ১০–২০ ডলার প্রতি রাত
  • মিড-রেঞ্জ হোটেল: ৩০–৬০ ডলার
  • লাক্সারি রিসোর্ট: ৮০–২০০ ডলার বা তার বেশি

খাবার ও স্থানীয় স্বাদ

সিয়েম রিপে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের খাবার সহজলভ্য।

  • স্থানীয় খাবারের মধ্যে আমক ট্রে (Amok Trey), খেমার নুডলস, আর লক লাক (Lok Lak) জনপ্রিয়।
  • একবেলা খাবারের গড় খরচ ৩–১০ ডলার।
  • মন্দির এলাকায় ঠান্ডা পানীয় ও ফল বিক্রেতাও পাওয়া যায়।

ভ্রমণের সেরা সময়

  • নভেম্বর থেকে মার্চ: ঠান্ডা ও শুষ্ক মৌসুম, ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আদর্শ।
  • জুন থেকে অক্টোবর: বর্ষাকালে মন্দির ও জঙ্গল আরও সবুজ হয়ে ওঠে, তবে কাদা-পানি কিছুটা অসুবিধা তৈরি করতে পারে।

কিছু দরকারি টিপস

  • মন্দিরে প্রবেশের সময় পরিচ্ছন্ন ও শালীন পোশাক পরা উচিত (কাঁধ ও হাঁটু ঢেকে রাখতে হবে)।
  • আরামদায়ক জুতা পরুন, কারণ হাঁটতে হয় অনেকটা পথ।
  • গরমে পানি, টুপি ও সানস্ক্রিন সঙ্গে রাখুন।

তা প্রহম এমন এক মন্দির, যেখানে প্রকৃতি ও ইতিহাস একসাথে নিঃশব্দে কথা বলে। গাছের শেকড় আর পাথরের দেয়ালের এই চিরন্তন আলিঙ্গন প্রাচীন সভ্যতার এক অনন্য প্রতীক। আঙকোর ওয়াট ও আঙকোর থম ঘুরতে এলে তা প্রহম না দেখা মানেই ভ্রমণ অসম্পূর্ণ।

Read Previous

খাগড়াছড়িতে ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার, স্বাভাবিক হচ্ছে পরিস্থিতি পর্যটন সংবাদ ডেস্ক

Read Next

ভগ্ন হলেও ইতিহাসের সাক্ষী—টাঙ্গাইলের হেমনগর জমিদার বাড়ি হতে পারে পর্যটনের নতুন গন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular