১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গাজায় যুদ্ধবিরতির পর খুলে গেল আল আজহার ইউনিভার্সিটি: ধ্বংসস্তূপের মাঝেই শিক্ষার্থীদের নতুন সূচনা

আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় -গাজা

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দুই বছরের নীরবতা শেষে আবারও জীবন ফিরে এসেছে গাজার আল আজহার ইউনিভার্সিটিতে। ইসরায়েলি আগ্রাসনে ধ্বংস হয়ে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টি অবশেষে যুদ্ধবিরতির পর পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। এক সময় বোমার শব্দে কেঁপে উঠত এই প্রাঙ্গণ, এখন সেখানে শোনা যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের হাসির শব্দ।

শিক্ষা ফিরে আসছে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে

২০২৩ সালে ইসরায়েলি হামলা শুরু হলে গাজার প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। আল আজহার ইউনিভার্সিটিও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির মূল ভবন এবং গবেষণাগারগুলো আইডিএফের বোমাবর্ষণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা দপ্তর (OCHA) জানিয়েছে, গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়েছে।

যুদ্ধের আগে গাজা উপত্যকায় ছিল ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ, যেখানে পড়াশোনা করত প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থী। সেই শিক্ষাজগত এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও, আল আজহার ইউনিভার্সিটির দরজা খুলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনিরা আবারো শিক্ষা পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে।

শিক্ষার্থীদের চোখে নতুন জীবন

বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এখন ভরে উঠেছে তরুণ-তরুণীদের কণ্ঠে। কেউ নতুন সেমিস্টারের ক্লাসে অংশ নিচ্ছে, কেউ বন্ধ হয়ে যাওয়া কোর্স পুনরায় শুরু করছে। অনেকের পরিবার এখনও শরণার্থী শিবিরে, কিন্তু তারা তবু বই হাতে ক্লাসে ফিরছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ শাবির স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, “এই উপস্থিতি কেবল শিক্ষার্থীর নয়—এটা আশা ও জীবনের প্রত্যাবর্তন।”

এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা যুদ্ধের ভয় পাই না। আমাদের ভয় একটাই—যদি শেখার সুযোগ হারিয়ে ফেলি।”

শিক্ষা খাতে ভয়াবহ ক্ষতি

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম The Guardian জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই গাজার সব ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়। Reuters-এর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী এখনও ভাঙা ভবনের পাশে বসে অনলাইন ক্লাস করছে মোবাইলের নেটওয়ার্কে ভর করে।
অনেক শিক্ষক এখন শরণার্থী ক্যাম্পে থাকলেও অনলাইন ক্লাস নিচ্ছেন সীমিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে।

পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা

গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। তবে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে এই প্রক্রিয়া ধীরগতির। আল আজহার ইউনিভার্সিটিতে আপাতত সীমিত পরিসরে ক্লাস শুরু হলেও, প্রশাসনের লক্ষ্য আগামী বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে সব বিভাগ চালু করা।

এছাড়া, কিছু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইন সহযোগিতা ও গবেষণার সুযোগ দিচ্ছে যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।

কেন এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ

আল আজহার ইউনিভার্সিটির পুনরায় চালু হওয়া শুধু শিক্ষার প্রতীক নয়, এটি গাজার মানুষের অদম্য মানসিকতার প্রমাণ। তারা প্রমাণ করছে, ধ্বংসের মাঝেও জ্ঞান ও জীবনের পথ বন্ধ হয় না।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশা তৈরি করবে। যদি আন্তর্জাতিক সহায়তা ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা অব্যাহত থাকে, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা আবার দাঁড়িয়ে যেতে পারে।

যুদ্ধ থেমে গেছে, কিন্তু ক্ষত এখনো গভীর। তবু গাজার তরুণরা আল আজহার ইউনিভার্সিটির প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছে। তাদের হাতে বই, মাথায় আশার আলো। হয়তো এই দৃশ্যটাই প্রমাণ করে—বোমা দিয়ে ভবন ধ্বংস করা যায়, কিন্তু শিক্ষা ও স্বপ্নের আগুন কখনো নিভে যায় না।

Read Previous

সিলেটে গড়ে উঠছে দেশের প্রথম ‘বর্ডার ড্রাইভ’ সড়ক: বদলে যাবে সীমান্ত পর্যটনের চিত্র

Read Next

এমিরেটসের নতুন উদ্যোগ: টার্বুলেন্স মোকাবিলায় তথ্য-নির্ভর কৌশল বিমান নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত খুলছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular