
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বিমান চলাচলে টার্বুলেন্স বা আকাশের অস্থিরতা বরাবরই এক অপ্রত্যাশিত চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তির অগ্রগতির পরও এই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি এমিরেটস এয়ারলাইনস এই চ্যালেঞ্জকে নতুনভাবে গ্রহণ করেছে। ক্রমবর্ধমান টার্বুলেন্সের তীব্রতা ও ঘনঘটাকে মাথায় রেখে তারা নিয়েছে এক বহুমাত্রিক, তথ্য-নির্ভর উদ্যোগ, যা শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তা নয়, বরং ফ্লাইট অভিজ্ঞতার মানও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে তুলছে।
এমিরেটস এখন রিয়েল-টাইম ডেটা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), এবং মেশিন লার্নিং (ML) ব্যবহার করে প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য পূর্বাভাসভিত্তিক পরিকল্পনা করছে, যেন পাইলটরা আগে থেকেই সম্ভাব্য অস্থিরতা শনাক্ত করে তা এড়িয়ে যেতে পারেন। এই উন্নত সিস্টেম শুধু ঝুঁকি কমাচ্ছে না, বরং জ্বালানি সাশ্রয় ও সময়নিষ্ঠতাও বাড়াচ্ছে।
স্কাইপাথ: আকাশের অস্থিরতা শনাক্তে এআই-এর ভূমিকা
গত বছর এমিরেটস স্কাইপাথ নামের একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে। স্কাইপাথের মূল কাজ হলো রিয়েল-টাইম টার্বুলেন্স ডেটা বিশ্লেষণ করে অস্থির এলাকার সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া। এটি হাজার হাজার বিমানের সেন্সর থেকে সংগৃহীত তথ্য, এডি ডিসিপেশন রেট (EDR) এবং স্বয়ংক্রিয় নির্ভরশীল নজরদারি-সম্প্রচার (ADSB) তথ্য একত্রিত করে বিশ্লেষণ করে।
সবচেয়ে অভিনব দিক হলো স্কাইপাথের নিজস্ব আইপ্যাড অ্যাক্সিলোমিটার প্রযুক্তি, যা ডিভাইসের ক্ষুদ্র নড়াচড়াকে ব্যবহার করে সুনির্দিষ্টভাবে টার্বুলেন্সের মাত্রা মাপতে পারে। এই ডেটা পাইলটদের কাছে পৌঁছে যায় সঙ্গে সঙ্গে, ফলে তারা আকাশে হঠাৎ তৈরি হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগেভাগেই এড়িয়ে চলতে পারেন।
স্কাইপাথের এআই-চালিত বিশ্লেষণ এমন এলাকাতেও পূর্বাভাস দিতে সক্ষম যেখানে কোনো বিমান বর্তমানে উড়ছে না—বিশেষ করে “ক্লিয়ার এয়ার টার্বুলেন্স” বা পরিষ্কার আকাশে অস্থিরতার ক্ষেত্রগুলোতে, যা সাধারণত প্রচলিত রাডার শনাক্ত করতে পারে না।
লিডো এমপাইলট: আবহাওয়ার সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাসে নতুন মাত্রা
লুফথানসা সিস্টেমের সঙ্গে এমিরেটসের দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে “লিডো এমপাইলট” অ্যাপ্লিকেশন। এটি একটি উন্নত নেভিগেশন ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, যা জার্মান আবহাওয়া পরিষেবাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে উচ্চ-নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করে।
এই অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে পাইলটরা লাইভ ক্লাউড কভারেজ, বায়ুপ্রবাহ, বরফ জমার সম্ভাবনা এবং টার্বুলেন্সের রিয়েল-টাইম মানচিত্র দেখতে পান। ফলে ফ্লাইট চলাকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও সহজ ও নিরাপদ হয়। এমিরেটস নিয়মিতভাবে লিডো দলের সঙ্গে কাজ করছে সিস্টেমের নির্ভুলতা এবং গ্লোবাল ডেটা কভারেজ বাড়ানোর জন্য।
IATA টার্বুলেন্স অ্যাওয়ার: বৈশ্বিক ডেটা শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম
২০২৪ সালে এমিরেটস যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান সংস্থা (IATA)-এর “টার্বুলেন্স অ্যাওয়ার” প্রোগ্রামে। এটি একধরনের বৈশ্বিক তথ্য-শেয়ারিং নেটওয়ার্ক, যেখানে অংশগ্রহণকারী বিমান সংস্থাগুলো তাদের রিয়েল-টাইম টার্বুলেন্স ডেটা আপলোড করে। এই ডেটা সংকলিত হয়ে তৈরি হয় বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলীয় মানচিত্র, যা ফ্লাইট পরিকল্পনাকে আরও নিরাপদ ও সুনির্দিষ্ট করে।
এমিরেটস এখন মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া জুড়ে নিজেদের ফ্লাইট থেকে সংগৃহীত তথ্য এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করছে। ফলে অন্য সংস্থাগুলোও সেই ডেটা ব্যবহার করতে পারছে, আর এমিরেটস নিজেও বিশ্বব্যাপী টার্বুলেন্স প্রবণতার আরও নির্ভরযোগ্য চিত্র পাচ্ছে।
ফলাফল: আরও নিরাপদ ও আরামদায়ক আকাশযাত্রা
এই তিনটি সিস্টেমের তথ্য একত্র করে এমিরেটস এখন তাদের “ইলেকট্রনিক ফ্লাইট ব্যাগ” অ্যাপে টার্বুলেন্স ভিজ্যুয়ালাইজেশন সরাসরি যুক্ত করেছে। পাইলটরা রিয়েল-টাইমে আকাশের অবস্থা দেখতে পাচ্ছেন, যা ফ্লাইট চলাকালে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়াতে সাহায্য করছে।
এই উদ্যোগের ফলাফল ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। টার্বুলেন্সজনিত হঠাৎ কাঁপুনি, অনাকাঙ্ক্ষিত আঘাত কিংবা ফ্লাইট বিলম্বের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। যাত্রীরা পাচ্ছেন আরও মসৃণ ফ্লাইট অভিজ্ঞতা, আর ক্রুরা পাচ্ছেন নিরাপদ কর্মপরিবেশ।
সব মিলিয়ে, এমিরেটসের এই তথ্য-নির্ভর টার্বুলেন্স ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি আধুনিক বিমান চলাচলের এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে—যেখানে প্রযুক্তি শুধু আকাশপথে গন্তব্যে পৌঁছানো নয়, বরং প্রতিটি যাত্রাকে করে তুলছে আরও বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ ও নিরাপদ।



