
শি-ট্রাম্প আনুষ্ঠানিক বৈঠক
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : দক্ষিণ কোরিয়ার বন্দরনগরী বুসানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক শেষ হয়েছে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা যৌথ ঘোষণা ছাড়াই। প্রায় এক ঘণ্টা ৪০ মিনিট স্থায়ী এই বৈঠক বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় শুরু হয়। ছয় বছর পর এই দুই বিশ্বনেতার মুখোমুখি হওয়ায় বৈঠক ঘিরে বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ছিল ব্যাপক আগ্রহ।
বৈঠকের প্রেক্ষাপট
এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে ট্রাম্প বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন, যেখানে বুসান শহরে চলছে এপেক (APEC) সম্পর্কিত কূটনৈতিক কার্যক্রম। অন্যদিকে, শি জিনপিংও এ সম্মেলনের আমন্ত্রণে উপস্থিত হন। তবে প্রধান সম্মেলনস্থল থেকে কিছুটা দূরে একান্ত বৈঠকের আয়োজন করা হয় দুই নেতার জন্য। নিরাপত্তা এবং সংবাদমাধ্যমের সীমিত উপস্থিতির কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে কূটনৈতিক সূত্র।
ট্রাম্প ও শির মধ্যে সর্বশেষ বৈঠকটি হয়েছিল ২০১৯ সালে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের সময়। সেই যুদ্ধই দুই দেশের সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এবারও আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাণিজ্য, শুল্কনীতি, বিরল খনিজ পদার্থ, মাদক চোরাচালান এবং কৃষিপণ্য আমদানি–রপ্তানি।
আলোচনায় প্রধান ইস্যুগুলো
১. বাণিজ্য ও শুল্কনীতি
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র চীনা পণ্যের ওপর গড়ে ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করে রেখেছে। বৈঠকে ট্রাম্প শুল্ক কিছুটা কমানোর ইঙ্গিত দেন, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। অন্যদিকে, চীনও যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিনসহ কৃষিপণ্য আমদানি পুনরায় বাড়ানোর আগ্রহ দেখায়। উভয় দেশই “বাণিজ্য যুদ্ধের” উত্তাপ কমাতে আগ্রহী বলে জানা গেছে।
২. বিরল খনিজ ও প্রযুক্তি রপ্তানি
চীন বর্তমানে বৈশ্বিক বিরল খনিজ সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। যুক্তরাষ্ট্র আশঙ্কা করছে, এসব খনিজের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তাদের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পে ঝুঁকি তৈরি করছে। এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হয়, তবে সিদ্ধান্ত হয়নি।
৩. মাদক চোরাচালান, বিশেষত ফেন্টানাইল
ফেন্টানাইল নামের প্রাণঘাতী সিনথেটিক মাদক যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, চীন থেকে এই মাদকের রাসায়নিক উপাদান পাচার হয়। বৈঠকে ট্রাম্প এই ইস্যুতে বেইজিংয়ের সহযোগিতা চান। শি জিনপিংও মাদকবিরোধী কার্যক্রমে পারস্পরিক সমন্বয়ের প্রতিশ্রুতি দেন বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।
৪. ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তা
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান প্রণালীর উত্তেজনা, দক্ষিণ চীন সাগরের সামরিকীকরণসহ বেশ কয়েকটি কৌশলগত ইস্যুতেও আলোচনা হয়। তবে এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি দুই নেতা।
ফলাফল ও প্রতিক্রিয়া
বৈঠক শেষে দুই নেতা কোনো যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেননি। উভয়েই পৃথকভাবে স্ব স্ব দেশে ফিরে গেছেন। হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, বৈঠক “খোলামেলা ও ফলপ্রসূ” ছিল, আর বেইজিং জানিয়েছে, “দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।”
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বৈঠকটিকে “ইঙ্গিতপূর্ণ কিন্তু সিদ্ধান্তহীন” হিসেবে বর্ণনা করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বড় কোনো চুক্তি না হলেও আলোচনাটিই নিজে একধরনের ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে—বিশেষ করে এমন সময়ে যখন দুই পরাশক্তির সম্পর্ক টানটান অবস্থায় রয়েছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি আগামী মাসগুলোতে দেখা যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা হতে হলে আরও রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। বৈঠকের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে সামান্য উত্থান দেখা যায়, যা বিনিয়োগকারীদের আশাবাদী মনোভাবের ইঙ্গিত বহন করে।শি
বুসানের বৈঠক কোনো নাটকীয় সমাধান দেয়নি, কিন্তু বরফ গলানোর সূচনা করেছে। দুই দেশের মধ্যে নতুন সংলাপের দরজা খুলেছে—যা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং কূটনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন সবার নজর ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে: তারা কি কথার চেয়ে কাজ দেখাতে পারবে? সময়ই তার উত্তর দেবে।



