পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে আবারও উত্তাপ ছড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে। দক্ষিণ কোরিয়ায় দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি দাবি করেছেন, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের সময় সাতটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল— যা কার্যত পাকিস্তানের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর থেকেই নয়াদিল্লি অস্বস্তিতে পড়েছে, আর ইসলামাবাদ কূটনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
দক্ষিণ কোরিয়ার এক আঞ্চলিক বৈঠকে বুধবার ট্রাম্প বলেন, “ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছিল। আমি তখন দুই দেশকেই ২৫০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিয়েছিলাম, যা তাদের থামিয়ে দেয়।” তার দাবি, এটাই ছিল কোনো দেশের প্রতি তার দেওয়া সবচেয়ে কঠোর বাণিজ্যিক হুঁশিয়ারি। তিনি আরও বলেন, “তখন সাতটি নতুন যুদ্ধবিমান গুলি করে নামানো হয়েছিল। যুদ্ধ প্রায় শুরু হয়ে যাচ্ছিল।”
এটা প্রথম নয়। দ্য ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে ট্রাম্প অন্তত ২৫ বার প্রকাশ্যে বলেছেন যে, ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে পাঁচ থেকে সাতটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছিল। যদিও এই দাবির সত্যতা নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে, তবুও তার মন্তব্য পাকিস্তানের পক্ষের বক্তব্যকে কূটনৈতিকভাবে বৈধতা দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
এদিকে নয়াদিল্লি বারবার বলেছে, পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে ভারতের কোনো যুদ্ধবিমান হারায়নি। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের মধ্যস্থতার কথাকেও “ভিত্তিহীন” বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত দুই দেশই পারস্পরিকভাবে নিয়েছিল।
তবুও ট্রাম্পের বক্তব্যে একাধিক ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে। তিনি একদিকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে “অসাধারণ যোদ্ধা” বলে প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতিও “গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা” দেখিয়েছেন। অর্থাৎ, ট্রাম্প একসঙ্গে দুই দেশকেই খুশি রাখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বাস্তবে তার বক্তব্যের ওজন বেশি পড়ছে পাকিস্তানের দিকে।
জাপানে ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া এক বক্তব্যেও ট্রাম্প একই দাবি পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বলেন, “দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ যুদ্ধের মুখে ছিল, আমি সেটি থামিয়েছি।” এই বক্তব্য ওয়াশিংটনের নীতিতে নতুন দিক উন্মোচন করেছে বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্লেষকেরা।
উইলসন সেন্টারের গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেছেন, আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ দেখছি।” কুগেলম্যানের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন বাণিজ্যিক স্বার্থেই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে, কিন্তু এখন বার্তাটি শুধু অর্থনীতিতেই সীমিত নেই; রাজনৈতিকভাবেও পাকিস্তানকে কাছের বন্ধু হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
এমনকি মার্কো রুবিও পাকিস্তানকে “মিত্র” বলে আখ্যা দিয়েছেন— যা সাম্প্রতিক মার্কিন নীতিতে বিরল এক ঘটনা। এই অবস্থান ভারতের কূটনীতিকদের জন্য নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্পের পাকিস্তানপ্রীতির প্রভাব পড়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সদ্য অনুষ্ঠিত আসিয়ান সম্মেলনে সরাসরি না গিয়ে অনলাইনে যোগ দেন। বিরোধী দল কংগ্রেস একে “কূটনৈতিক পিছু হটা” বলে সমালোচনা করেছে। রাহুল গান্ধী বলেন, “বিব্রত হওয়ার ভয়ে মোদি বৈশ্বিক মঞ্চ এড়িয়ে গেলেন।”
অন্যদিকে, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্ত নিয়ে ট্রাম্প বলেন, “ওটা আমার জন্য সহজে সমাধানযোগ্য সমস্যা।” তিনি পাকিস্তানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, “ওরা দারুণ মানুষ।” এই বক্তব্য ইসলামাবাদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় কূটনৈতিক প্রাপ্তি।
তবে ট্রাম্প এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে একটি বড় বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের দাবিকে শক্তিশালী করলেও, তার অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এখনো ভারতের সঙ্গেই।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ট্রাম্পের এই মন্তব্য দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে নতুন তরঙ্গ তুলেছে। পাকিস্তান আপাতত কূটনৈতিকভাবে কিছুটা এগিয়ে গেলেও, যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব স্বার্থ এখনো বাণিজ্য ও কৌশলগত ভারসাম্যের দিকেই ঝুঁকে আছে। ভারতের জন্য এটি সতর্কবার্তা— এবং পাকিস্তানের জন্য এক ধরনের কূটনৈতিক সুযোগ।



