
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: কম্বোডিয়ার রাজধানী ফনম পেন থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চেউং এক কিলিং ফিল্ড (Choeung Ek Killing Field) হলো এমন এক স্থান, যেখানে নীরবতা এখনো ইতিহাসের ভয়াবহ কান্না বয়ে আনে। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত খেমার রুজ (Khmer Rouge) শাসনামলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ এই স্থানে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। আজ এটি একটি স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর—যেখানে পর্যটকরা শুধু ইতিহাস দেখেন না, ইতিহাসকে অনুভব করেন।
ইতিহাস ও পটভূমি
১৯৭৫ সালে পল পট নেতৃত্বাধীন খেমার রুজ ক্ষমতায় আসে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কম্বোডিয়াকে একটি কৃষিভিত্তিক “শুদ্ধ সমাজে” রূপান্তর করা। সেই লক্ষ্যে তারা বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার, ধর্মীয় নেতা এমনকি সাধারণ মানুষকেও “রাষ্ট্রবিরোধী” বলে হত্যা করেছিল।
টুল স্লেং কারাগার (S-21) থেকে বন্দিদের এখানে আনা হতো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য। তারা গুলি ব্যবহার করত না, কারণ গুলির খরচ বাঁচাতে চাইত। বরং কৃষি যন্ত্র, হাতুড়ি, কাঠের লাঠি ইত্যাদি ব্যবহার করে হত্যা করা হতো। নিহতদের গণকবর দেওয়া হতো মাটির নিচে।
১৯৮০ সালে এই স্থানটি আবিষ্কৃত হলে প্রায় ৮,৯০০টিরও বেশি মৃতদেহের হাড়গোড় ও খুলির সন্ধান পাওয়া যায়।
বর্তমান অবস্থা ও ঐতিহ্য
আজ কিলিং ফিল্ডকে একটি শান্ত স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানে একটি ৮ স্তর বিশিষ্ট স্টূপা (Buddhist Stupa) তৈরি করা হয়েছে, যার ভেতরে রয়েছে হাজারো মানুষের খুলি ও হাড়—নিহতদের স্মরণে।
প্রতিটি গর্তের পাশে চিহ্ন দেওয়া আছে, কোথা থেকে কত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দর্শনার্থীরা হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পান সেই ভৌতিক নীরবতা, যেখানে একসময় ভয়াবহ আর্তনাদে আকাশ কেঁপে উঠেছিল।
সংস্কৃতি ও মানবতার শিক্ষা
কিলিং ফিল্ড শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়; এটি মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ অপরাধের প্রতীক। কম্বোডিয়ানরা এই স্থানকে শিক্ষার জায়গা হিসেবে দেখে—যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন নির্মমতা পুনরায় ঘটাতে না পারে।
প্রতি বছর এপ্রিল মাসে এখানে “Remembrance Day” পালন করা হয়, যেখানে স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকরা নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
প্রাকৃতিক পরিবেশ
চেউং এক কিলিং ফিল্ডে প্রবেশ করলে প্রথমেই লক্ষ্য করবেন—চারপাশে গাছপালা, ছোট লেক, পাখির ডাক। প্রকৃতির এই শান্ত সৌন্দর্য আর ইতিহাসের ভয়াবহ বাস্তবতা একসঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করে।
প্রবেশমূল্য
- প্রবেশ ফি: প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৬ মার্কিন ডলার (অডিও গাইডসহ)
- শিশুদের (১২ বছরের নিচে) প্রবেশ ফ্রি
- টিকিটের সঙ্গে অডিও গাইডে ১৫টি ভাষায় বর্ণনা শোনা যায়, যার মধ্যে ইংরেজি অন্যতম।
বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭০০ টাকা।
যাতায়াত ব্যবস্থা
- ফনম পেন থেকে দূরত্ব: প্রায় ১৫ কিলোমিটার
- টুকটুক ভাড়া: যাওয়া-আসা মিলিয়ে ৮–১০ ডলার
- ট্যাক্সি: একদিকের জন্য ১২–১৫ ডলার
- মোটরবাইক ভাড়া: দিনে ৭–১০ ডলার
ভ্রমণ শুরু করার জন্য সকাল বা বিকেলের সময় বেছে নেওয়া ভালো, কারণ দুপুরে গরম পড়ে।
থাকার ব্যবস্থা
কিলিং ফিল্ড এলাকায় সরাসরি থাকার জায়গা না থাকলেও, ফনম পেন শহরে সব রকম বাজেটের হোটেল ও গেস্টহাউস পাওয়া যায়।
- বাজেট হোটেল: প্রতি রাত ১২–২০ ডলার
- মিড-রেঞ্জ: ৩০–৫০ ডলার
- লাক্সারি হোটেল: ৭০–২০০ ডলার
জনপ্রিয় থাকার জায়গার মধ্যে আছে Okay Boutique Hotel, Plantation Urban Resort, এবং Rambutan Resort।
খাবার ও স্থানীয় স্বাদ
ফনম পেন শহরে কম্বোডিয়ান ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রেস্তোরাঁও আছে।
- জনপ্রিয় খাবার: Fish Amok, Khmer Red Curry, Nom Banh Chok (খেমার নুডলস)
- একবেলা খাবারের গড় খরচ ৪–১০ ডলার
ভ্রমণের সেরা সময়
নভেম্বর থেকে মার্চ—এই সময় আবহাওয়া ঠান্ডা ও শুষ্ক থাকে, ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। বর্ষার মৌসুম (জুন–অক্টোবর) এলে জায়গাটি কাদা হয়ে যায়, কিন্তু চারপাশের সবুজতা বেড়ে যায়।
টিপস
- শান্ত পরিবেশ বজায় রাখুন; এটি বিনোদনের নয়, স্মৃতির স্থান।
- ছবি তুলতে পারবেন, তবে কিছু জায়গায় নিষেধ আছে—চিহ্নগুলো দেখে নিন।
- আরামদায়ক জুতা, টুপি, পানি ও সানস্ক্রিন সঙ্গে রাখুন।
কিলিং ফিল্ড এমন এক স্থান যা মানুষকে কাঁদায়, ভাবায়, শেখায়। এটি মনে করিয়ে দেয়—অন্ধ মতাদর্শ ও মানববিরোধী রাজনীতির ফল কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ইতিহাসের এই নির্মম অধ্যায় দেখতে গেলে শুধু চোখে নয়, মনেও একটা ভার রেখে আসে।



