
ফাইল ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: একসময় মনে করা হতো— পাসপোর্টে যত বেশি দেশের ভিসা থাকবে, তার মালিক তত সম্মানিত। বাংলাদেশি ভ্রমণপিপাসুরাও তখন আশায় বুক বাঁধতেন— একদিন আমরাও পৃথিবী ঘুরে দেখব। কিন্তু এখন চিত্র পুরো উল্টো। সবুজ মলাটের সেই পাসপোর্ট নিয়ে পৃথিবীর অনেক দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একে একে।
উন্নত দেশ তো দূরের কথা, প্রতিবেশীরাও অনাগ্রহী
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য— থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর— বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়ায় কঠোরতা বাড়িয়েছে। আগে যেখানে ৭-১০ কার্যদিবসে ভিসা মেলে, এখন তা ৪৫ দিনেও নিশ্চিত নয়। অনেকের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে, আবার যাঁরা ভিসা পাচ্ছেন, তাঁদেরও বিমানবন্দরে নানা অজুহাতে ‘অফলোড’ করা হচ্ছে।
আরও দুঃখজনক বিষয় হলো, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কার মতো বন্ধুত্বপূর্ণ পর্যটননির্ভর দেশও বাংলাদেশিদের প্রবেশে কঠোর হচ্ছে। অন-অ্যারাইভাল সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেককে বিমানবন্দর থেকেই ফেরত পাঠানো হচ্ছে। অভিযোগ— ভুয়া হোটেল বুকিং, পর্যাপ্ত অর্থ না থাকা বা সন্দেহজনক ভ্রমণ পরিকল্পনা।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
বাংলাদেশি পাসপোর্টের প্রতি এই অনীহার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ভিসার অপব্যবহার ও অবৈধ অভিবাসনকে। পর্যটন ভিসায় গিয়ে অনেকেই দেশে না ফিরে স্থানীয়ভাবে কাজ খোঁজেন বা অন্য দেশে পাড়ি জমান। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ জানিয়েছে— বাংলাদেশিরা পর্যটন ভিসাকে শ্রমবাজারে প্রবেশের গোপন পথ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
বাংলাদেশ পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দালালচক্রের মাধ্যমে অনেক যাত্রীকে ভুল তথ্য দিয়ে পাঠানো হয়। তাঁদের শেখানো হয় কীভাবে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন এড়াতে হয়। এসব অবৈধ কার্যকলাপই এখন পুরো জাতির ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।
থাইল্যান্ডে ৪৫ দিনের ভিসা বিলম্ব
থাইল্যান্ডে বর্তমানে ই-ভিসা চালু হলেও বাংলাদেশিদের আবেদন প্রক্রিয়া অন্য দেশগুলোর তুলনায় অস্বাভাবিক দীর্ঘ। পাসপোর্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট, ট্রেড লাইসেন্স— সব জমা দেওয়ার পরও মাসখানেকের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকের ট্যুর ভেস্তে যাচ্ছে এই বিলম্বে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কও জটিল
২০২৪ সালের আগস্টে ভারত নতুন ভিসা কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু মেডিকেল ভিসা চালু থাকলেও তাতেও কঠোর যাচাই চলছে। অন্যদিকে কাতার, বাহরাইন, মিশর, দুবাই, আবুধাবি, ভিয়েতনাম— সবাই একে একে ভিসা বন্ধ বা সীমিত করছে। তুরস্ক ও ফিলিপাইনও প্রক্রিয়া জটিল করেছে।
টোয়াবের সভাপতি রাফিউজ্জামান রাফি বলেন,
“বাংলাদেশি পর্যটকরা বিদেশ ভ্রমণ কমিয়ে দিচ্ছেন। এতে ট্যুর অপারেটররা বিপাকে পড়ছেন। সরকারের উচিত দ্রুত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে কথা বলা।”
নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কায় বাড়ছে সন্দেহ
নেপালে বিনামূল্যে ট্যুরিস্ট ভিসা সুবিধা থাকলেও এখন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা বাংলাদেশিদের অতিরিক্ত জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। অনেকেই নতুন পাসপোর্ট নিয়ে ভ্রমণে গেলে সন্দেহ তৈরি হয়।
একই অবস্থা শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপেও। সেখানে অনেকে ভুয়া বুকিং দেখিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করায় এখন কঠোর যাচাই চলছে।
এক সময়ের মর্যাদা এখন হারিয়ে গেছে
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের সর্বশেষ র্যাংকিং অনুযায়ী, বাংলাদেশের পাসপোর্ট এখন বিশ্বের ৯৪তম স্থানে— দুই দশক আগের ৬৮তম অবস্থান থেকে অনেক নিচে। এই তালিকায় বাংলাদেশের পাশে এখন ফিলিস্তিন ও ইরিত্রিয়ার মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ।
ভবিষ্যতের পথ
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ মনে করেন,
“আমরা নিজেদের আচরণ, অভ্যাস আর মানসিকতা না বদলালে কোনো দেশই সহজে বিশ্বাস করবে না। বৈধভাবে ভ্রমণ করলেই বিদেশিরা আমাদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা নেবে। তবেই আবার খুলবে সেই বন্ধ দরজাগুলো।”
বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা পুনরুদ্ধার এখন শুধু সরকারের নয়, প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্বও বটে। আইন মেনে চলা, সৎ ভ্রমণ নথি ব্যবহার, এবং ভিসার শর্ত সম্মান করা— এই তিনটি জিনিসই হয়তো ফেরাতে পারে হারানো বিশ্বাস।
প্রতিবেদক: মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



