১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গার্মেন্ট খাতের ধস: অর্ডার বাতিল, কারখানা বন্ধ ও রপ্তানি সংকটে বাংলাদেশ

ছবি: সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের পোশাক শিল্প একের পর এক ধাক্কা খাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস ঘাটতি, বিমানবন্দরের জটিলতা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কর্মবিরতি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে ভয় পাচ্ছেন। অনেকেই ইতোমধ্যে পুরোনো অর্ডার বাতিল করেছেন, আর যেগুলো এখনো কার্যকর, সেগুলোর ডেলিভারি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

গত এক বছরে প্রায় দুই শতাধিক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে—এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো। বন্ধ কারখানার সংখ্যা বাড়তে থাকায় রপ্তানি আয় কমছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে এবং ব্যাংক ঋণ পরিশোধে নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে। শিল্প মালিকদের আশঙ্কা, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন ব্যাহত

পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন জ্বালানি সরবরাহ। অনেক কারখানায় দিনে কয়েক ঘণ্টা গ্যাস থাকে না, ফলে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিদ্যুতের অস্থির সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। একদিকে কাঁচামালের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, “গ্যাস, বিদ্যুৎ, বিমানবন্দরের জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক বাধা—সব মিলিয়ে গার্মেন্ট খাত এখন সংকট ব্যবস্থাপনার অবস্থায় আছে। আমরা উৎপাদনের চেয়ে সংকট সামলাতেই বেশি সময় দিচ্ছি।”

বিমানবন্দর ও সরবরাহ চেইনে জটিলতা

সম্প্রতি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ড ও লজিস্টিক জটিলতা রপ্তানি প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারায় অনেক রপ্তানিকারক বাধ্য হচ্ছেন ব্যয়বহুল বিমানপথে পণ্য পাঠাতে, যা মুনাফা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, “বিমানবন্দরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নতুন অর্ডারও ধীর গতিতে আসছে। আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা পুনরুদ্ধারে সময় লাগবে।”

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা উদ্বেগে বিদেশি ক্রেতারা সরে যাচ্ছেন

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হারানোই এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। সাম্প্রতিক আন্দোলন, অবরোধ ও কর্মবিরতির কারণে অনেক ক্রেতা তাদের অর্ডার ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে সরিয়ে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, “দেশে এখন সার্বিক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা জানতে চায়—অর্ডার দিলে তারা সময়মতো পণ্য পাবে কি না। আমরা স্পষ্ট জবাব দিতে পারি না। এই অবস্থা চলতে থাকলে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।”

আর্থিক চাপ ও কর্মসংস্থান সংকট বাড়ছে

কারখানা বন্ধ মানে শুধু উৎপাদন বন্ধ নয়, হাজার হাজার শ্রমিকের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়া। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। ফলে শিল্প খাতজুড়ে তৈরি হচ্ছে একটি অচলাবস্থা, যার প্রভাব পড়ছে ব্যাংক খাত ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন পাভেল বলেন, “বিদেশি ক্রেতারা এখন আর আগের মতো আত্মবিশ্বাসী নন। তারা আশঙ্কা করছেন—সময়ে পণ্য না পেলে তাদের ক্ষতি হবে। তাই তারা অন্য দেশে বেশি দাম দিয়েও অর্ডার সরিয়ে নিচ্ছে। এটা শুধু ব্যবসার ক্ষতি নয়, দেশের ভাবমূর্তিরও ক্ষতি।”

সমাধান ছাড়া খাতের ভবিষ্যৎ অন্ধকার

বিশ্লেষকদের মতে, যদি এখনই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে না আনা যায় এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হয়, তবে পোশাক খাত দীর্ঘমেয়াদে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস এই খাত ভেঙে পড়লে অর্থনীতির ভিত্তিই নড়ে যাবে।

শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে সরকারের উচিত দ্রুত জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা সংস্কার করা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা। না হলে যে শিল্প একসময় বাংলাদেশের সাফল্যের প্রতীক ছিল, সেটি পরিণত হবে স্থায়ী সংকটের প্রতীকে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টায় গার্মেন্ট খাত শুধু অস্থির নয়—এখন টিকে থাকার লড়াই করছে। অর্ডার হারানো, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কর্মসংস্থান কমে যাওয়া এবং ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া—সব মিলিয়ে এই শিল্প আজ ক্রান্তিকালে। এখনই যদি সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, বাংলাদেশ তার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তিকে হারাতে পারে।

Read Previous

প্রবাসী বিএনপির সদস্যপদ নবায়ন ও নতুন নিবন্ধনে অনলাইন যুগে প্রবেশ

Read Next

সম্প্রীতির দৌড়: রাঙ্গামাটিতে পুলিশ সুপার কাপ মিনি ম্যারাথন ও হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা সম্পন্ন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular