
গ্রাফিক্স : পর্যটন সংবাদ
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বিশ্ব পর্যটন শিল্পে এশিয়া এখন দ্রুততম বর্ধনশীল অঞ্চলগুলোর একটি। কোভিড পরবর্তী সময়ে ইউরোপ ও আমেরিকার পাশাপাশি এশিয়ার বিভিন্ন দেশ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আবারও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। উন্নত অবকাঠামো, সহজ ভিসা ব্যবস্থা, পরিকল্পিত বিপণন এবং পর্যটকবান্ধব পরিবেশের কারণে চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো এশিয়ায় পর্যটন খাতে স্পষ্টভাবে এগিয়ে রয়েছে। এসব দেশে প্রতিবছর কোটি কোটি বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করছেন, যা সরাসরি জাতীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে।
চীন বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ পর্যটক গ্রহণকারী দেশ। দেশটির বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি, হাজার বছরের ইতিহাস, আধুনিক শহর ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা একসঙ্গে পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। একইভাবে জাপান তার অনন্য সংস্কৃতি, প্রযুক্তিনির্ভর নগর জীবন, ঐতিহ্যবাহী মন্দির এবং নিরাপদ ভ্রমণ পরিবেশের কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। থাইল্যান্ড বহু বছর ধরেই এশিয়ার পর্যটন হাব হিসেবে পরিচিত। সমুদ্রসৈকত, নাইটলাইফ, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি এবং তুলনামূলক কম খরচে ভ্রমণের সুযোগ দেশটিকে পর্যটকদের প্রথম পছন্দে পরিণত করেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরেকটি সফল উদাহরণ হলো মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর। মালয়েশিয়া পরিকল্পিত পর্যটন নীতি, বহুজাতিক সংস্কৃতি এবং উন্নত অবকাঠামোর মাধ্যমে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক পর্যটক আকর্ষণ করছে। সিঙ্গাপুর আয়তনে ছোট হলেও আন্তর্জাতিক বিমান সংযোগ, স্মার্ট সিটি ব্যবস্থাপনা এবং বিশ্বমানের বিনোদন সুবিধার কারণে পর্যটনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়াও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটন খাতে বড় অগ্রগতি দেখিয়েছে। ভিয়েতনাম তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ইতিহাসকে আধুনিক পর্যটন প্যাকেজে রূপান্তর করেছে, আর দক্ষিণ কোরিয়া সংস্কৃতি, কে-পপ ও আধুনিক জীবনধারার মাধ্যমে তরুণ পর্যটকদের টানতে সক্ষম হয়েছে।
এশিয়ার এসব দেশের এগিয়ে থাকার পেছনে কয়েকটি সাধারণ কারণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথমত, তাদের ভিসা নীতি তুলনামূলক সহজ ও পর্যটকবান্ধব। ই-ভিসা, ভিসা অন অ্যারাইভাল কিংবা স্বল্প সময়ের মধ্যে ভিসা প্রদানের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করে। দ্বিতীয়ত, এসব দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। বিমানবন্দর, সড়ক, রেল ও অভ্যন্তরীণ পরিবহন পর্যটকদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্য তৈরি করে। তৃতীয়ত, পর্যটন খাতকে শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ ও সরকারি সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের বিপণন ও ব্র্যান্ডিং, যা দেশগুলোর পর্যটন পরিচিতিকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে পর্যটন সম্ভাবনার দেশ বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটন খাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। বিশ্ব পর্যটন উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান নিচের দিকে, যা দেশের পর্যটন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা প্রতিবছর তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং পর্যটন থেকে জাতীয় আয়ে অবদানও সীমিত।
বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে অবকাঠামোগত দুর্বলতা। অনেক পর্যটন এলাকায় মানসম্মত সড়ক, পরিবহন, হোটেল ও বিনোদন সুবিধার অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সেবা এখনো সীমিত পরিসরে গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, ভিসা প্রক্রিয়া এখনো জটিল ও সময়সাপেক্ষ বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক পর্যটক ভিসা জটিলতার কারণে বাংলাদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা বাদ দেন। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়, সেটিও পর্যটকদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের পর্যটন খাতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব। প্রতিবেশী অনেক দেশ নিজেদের পর্যটন পরিচিতি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ সেই জায়গায় পিছিয়ে। আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা, ডিজিটাল মার্কেটিং কিংবা বৈশ্বিক প্রচারণায় বাংলাদেশের উপস্থিতি সীমিত। ফলে কক্সবাজার, সুন্দরবন কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো বিশ্বমানের পর্যটন গন্তব্য থাকা সত্ত্বেও সেগুলো অনেক বিদেশির কাছেই অজানা রয়ে গেছে।
তবে এই বাস্তবতার মাঝেও বাংলাদেশের জন্য সুযোগের অভাব নেই। পর্যটন খাতে উত্তরণের প্রথম শর্ত হলো ভিসা ব্যবস্থাকে সহজ ও দ্রুত করা। ই-ভিসা ও ভিসা অন অ্যারাইভাল কার্যকরভাবে চালু হলে বিদেশি পর্যটক আগ্রহী হবে। একই সঙ্গে বিমানবন্দর, সড়ক ও পর্যটন এলাকায় আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যটন পুলিশের কার্যক্রম জোরদার করা এবং পর্যটক সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা জরুরি।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় শক্তি হলো স্থানীয় সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠী। স্থানীয় মানুষকে পর্যটন কার্যক্রমে যুক্ত করে গাইড, হোমস্টে, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক উৎসবকে কেন্দ্র করে টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব। এতে একদিকে পর্যটকরা বাস্তব অভিজ্ঞতা পাবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এশিয়ায় পর্যটন খাতে যেসব দেশ এগিয়ে রয়েছে তারা পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও বিপণনে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশ যদি একইভাবে পর্যটনকে একটি কৌশলগত শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে এই খাত থেকে বিপুল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুফল পাওয়া সম্ভব। সঠিক সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশও এশিয়ার পর্যটন মানচিত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।



