ভিয়েতনামে টেকসই পর্যটনের নতুন মাইলফলক: আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেল ‘লিটল ভিলেজ’ পপ-আপ রিসোর্ট

ভিয়েতনাম গ্রাম

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বিশ্বজুড়ে পর্যটন শিল্প যখন পরিবেশগত ক্ষতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং স্থানীয় সংস্কৃতি বিলুপ্তির মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন টেকসই পর্যটন ধীরে ধীরে ভবিষ্যতের একমাত্র বাস্তব পথ হিসেবে উঠে আসছে। এই প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের একটি ব্যতিক্রমী পর্যটন উদ্যোগ ‘লিটল ভিলেজ’ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সম্প্রতি গুড ট্রাভেল গাইড প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত সার্টিফিকেশন ফলাফলে দেখা গেছে, লিটল ভিলেজ দায়িত্বশীল ও টেকসই পর্যটনের আন্তর্জাতিক মানচিত্রে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

গুড ট্রাভেল গাইড মূলত একটি বৈশ্বিক তথ্যভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে কেবল সেইসব গন্তব্য ও পর্যটন সুবিধাকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয় যারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টেকসই উন্নয়ন মানদণ্ড পূরণ করে। এই তালিকায় লিটল ভিলেজের অন্তর্ভুক্তি শুধু একটি সার্টিফিকেট প্রাপ্তির ঘটনা নয়, বরং ভিয়েতনামের পর্যটন খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

জিএসটিসি মানদণ্ডে লেভেল ১ অর্জন
লিটল ভিলেজ ‘গুড ট্রাভেল সিল’ সার্টিফিকেশনের লেভেল ১ অর্জন করেছে। এই স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে গ্লোবাল সাসটেইনেবল ট্যুরিজম কাউন্সিল বা জিএসটিসি নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে। মূল্যায়ন অনুযায়ী, লিটল ভিলেজ মোট ৬২টি টেকসই মানদণ্ড পূরণ করেছে, যা ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র জুড়ে বিস্তৃত।

এই ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা, কর্মীদের ন্যায্য অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ, স্থানীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন, এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য ইতিবাচক সামাজিক অবদান। পাশাপাশি আদিবাসী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে অভিযোজন, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য ও দূষণ কমানো এবং টেকসই খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত।

পপ-আপ রিসোর্ট: ভিন্নধর্মী একটি মডেল
লিটল ভিলেজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর পপ-আপ রিসোর্ট মডেল। প্রচলিত স্থায়ী ও ভারী অবকাঠামোর পরিবর্তে এই মডেলটি পরিবেশবান্ধব নির্মাণ কৌশল ব্যবহার করে, যা প্রাকৃতিক পরিবেশে কম হস্তক্ষেপ করে। প্রয়োজনে সহজেই স্থাপন, পরিবর্তন বা অপসারণ করা যায় এমন কাঠামো ব্যবহার করার ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে।

ল্যাং নো পর্যটন এলাকার মালিক ও উদ্যোক্তা মিঃ নুয়েন মান বিন সান মনে করেন, এই মডেল ভিয়েতনামের বাস্তবতা ও প্রাকৃতিক অবস্থার সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। তার মতে, ভিয়েতনামের পর্যটন খাত মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগনির্ভর। ফলে উচ্চ ব্যয়বহুল অবকাঠামোর বদলে কম বিনিয়োগে পরিচালনাযোগ্য, নমনীয় ও পরিবেশবান্ধব মডেলই দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে।

অর্থনীতি ও পরিবেশের ভারসাম্য
মিঃ সান বলেন, পপ-আপ রিসোর্ট মডেলটি যুক্তিসঙ্গত বিনিয়োগ খরচের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক সুযোগ তৈরি করে। একই সঙ্গে এটি বাজারের ওঠানামা, পর্যটকের চাহিদা এবং প্রাকৃতিক পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম। তার ভাষায়, “এই মডেল শুধু ব্যবসার জন্য নয়, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের জন্যও ইতিবাচক।”

লিটল ভিলেজের গুড ট্রাভেল সিল অর্জন প্রমাণ করে যে, টেকসই পর্যটন মানে শুধু পরিবেশ রক্ষা নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা দর্শন। যেখানে অর্থনীতি, সমাজ ও প্রকৃতি—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়।

প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা
লিটল ভিলেজে ভ্রমণে আসা পর্যটকরা প্রচলিত বিলাসবহুল রিসোর্টের অভিজ্ঞতার বদলে প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সহাবস্থানের সুযোগ পান। ঝোপঝাড়ে ঘেরা পরিবেশে বিশ্রাম, বনের ভেতর দিয়ে ঝর্ণা পার হওয়া হাঁটাপথ, স্থানীয় সংস্কৃতিনির্ভর জীবনযাপন—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের ধীরগতির, সচেতন ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

এই ধরনের অভিজ্ঞতা আধুনিক পর্যটকদের কাছে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যারা ভ্রমণকে কেবল বিনোদন নয়, বরং প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি উপায় হিসেবে দেখছেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্ব
গুড ট্রাভেল সিল সার্টিফিকেশন জিএসটিসির মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা জাতিসংঘ পর্যটন সংস্থা, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্বারা স্বীকৃত। ফলে এই স্বীকৃতি লিটল ভিলেজকে শুধু আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে না, বরং ভিয়েতনামের পর্যটন শিল্পের জন্য একটি মানদণ্ড স্থাপন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, লিটল ভিলেজের এই অর্জন ভিয়েতনামের অন্যান্য পর্যটন উদ্যোক্তাদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা হতে পারে। এটি দেখিয়ে দেয় যে সঠিক পরিকল্পনা, দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আন্তর্জাতিক মানের টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব।

সব মিলিয়ে বলা যায়, লিটল ভিলেজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি শুধু একটি রিসোর্টের সাফল্য নয়, বরং ভিয়েতনামের টেকসই পর্যটন ভবিষ্যতের একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা।

Read Previous

ফ্লোরেন্সের ডোমো: রেনেসাঁর গৌরব, বিশ্বাস ও স্থাপত্যের এক অনন্য বিস্ময়

Read Next

এশিয়ায় পর্যটনে এগিয়ে কারা, বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে এবং উত্তরণের পথ কী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular