১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তিন শতকের আগুনে গড়া এক কিংবদন্তি: মাদ্রিদের ‘সবরিনো দে বোতিন’ ও সময়কে অতিক্রম করা স্প্যানিশ স্বাদ

সবরিনো দে বোতিন

সবরিনো দে বোতিন, ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : মাদ্রিদের পুরোনো শহরের অলিগলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় মনে হতে পারে, আপনি বুঝি আধুনিক ইউরোপ ছেড়ে কয়েক শতাব্দী পেছনে ফিরে যাচ্ছেন। পাথরের রাস্তা, সংকীর্ণ গলি, পুরোনো বাড়ির বারান্দা—সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে এক ধরনের চাপা নীরবতা কাজ করে। ঠিক এমনই এক গলিতে, ‘কাইয়ে দে কুচিয়েরোস’-এ দাঁড়িয়ে আছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যা শুধু মাদ্রিদের নয়, গোটা বিশ্বের খাদ্য ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। নাম তার ‘সবরিনো দে বোতিন’। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি অনুযায়ী, এটি বিশ্বের প্রাচীনতম চলমান রেস্তোরাঁ। সম্প্রতি এই ঐতিহাসিক ভোজনালয়টি পূর্ণ করেছে তার ৩০০ বছরের গৌরবময় পথচলা।

১৭২৫ সালে যাত্রা শুরু করা বোতিনের বয়স যখন বাড়তে থাকে, তখন পৃথিবীর মানচিত্রই ছিল ভিন্ন। তখনো যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়নি, শিল্পবিপ্লব ইউরোপে পুরোপুরি দানা বাঁধেনি, আর মাদ্রিদ ছিল সদ্য রাজধানী হওয়া এক রাজকীয় শহর। সেই সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বোতিন ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শুধু একটি খাবারের দোকান হিসেবে নয়, বরং এক জীবন্ত ঐতিহ্য হিসেবে।

বোতিনের ইতিহাস বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় তার ভবনটির জন্মকথায়। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভবনটি প্রথম নির্মিত হয় ১৫৯০ সালের দিকে, যখন স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ মাদ্রিদকে রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করার পর শহরটির দ্রুত সম্প্রসারণ শুরু হয়। তখন এটি ছিল একটি সাধারণ আবাসিক ভবন। প্রায় একশ বছরেরও বেশি সময় পরে, ১৭১৫ সালে ফ্রান্স থেকে আগত শেফ জিন বোতিন তার স্ত্রীকে নিয়ে মাদ্রিদে আসেন এবং রাজদরবারে কাজ শুরু করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৭২৫ সালে জিন বোতিনের ভাগ্নে ক্যানডিডো রেমিস এই ভবনটি লিজ নিয়ে একটি সরাইখানা চালু করেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘সবরিনো দে বোতিন’—অর্থাৎ ‘বোতিনের ভাগ্নে’।

সেই সময়ের রেস্তোরাঁ সংস্কৃতি আজকের মতো ছিল না। তখনকার ইউরোপে এগুলো মূলত পরিচিত ছিল ‘কাসা দে কোমিদা’ নামে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা বণিক, ব্যবসায়ী কিংবা পর্যটকেরা এখানে রাত কাটাতেন। মজার বিষয় হলো, তখনকার দিনে রেস্তোরাঁগুলো নিজস্ব উপকরণ সরবরাহ করত না। অতিথিরাই বাজার থেকে মাংস, মাছ বা সবজি কিনে আনতেন, আর রেস্তোরাঁর রাঁধুনিরা নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তা রান্না করে দিতেন। বোতিনও শুরুতে ঠিক এইভাবেই চলত।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বোতিনের চরিত্র বদলাতে থাকে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে এটি একটি কনফেকশনারিতে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ফরাসি রন্ধনশৈলীর প্রভাব বাড়তে থাকলে বোতিন নিজেকে ধীরে ধীরে একটি পরিপূর্ণ রেস্তোরাঁ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৩০ সালে গঞ্জালেজ পরিবার এটি কিনে নেয় এবং সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত তারাই বোতিনের দায়িত্বে রয়েছে। তিন প্রজন্ম ধরে একই পরিবার একটি প্রতিষ্ঠানকে একই ঐতিহ্যে বাঁচিয়ে রেখেছে—ইউরোপের খাদ্য ইতিহাসে যা বিরল উদাহরণ।

বোতিনের দীর্ঘ পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময়, যখন মাদ্রিদ ছিল সংঘর্ষ আর অনিশ্চয়তার কেন্দ্রে, তখন শহরের বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বোতিনের রান্নাঘর বন্ধ হয়নি। সেই সময় তারা ক্ষুধার্ত সৈনিক ও সাধারণ মানুষের জন্য খাবার রান্না করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপের অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছুই বোতিন দেখেছে খুব কাছ থেকে।

আধুনিক যুগে এসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে কোভিড-১৯ মহামারীর সময়। যখন লকডাউনে ইউরোপের প্রায় সব রেস্তোরাঁ বন্ধ, তখন বোতিনও অতিথি গ্রহণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। কিন্তু এখানকার তিন শতাব্দী পুরোনো কাঠের উনুনের আগুন নিভতে দেওয়া হয়নি। প্রতিদিন নিয়ম করে সেই উনুন জ্বালানো হয়েছে। মালিকপক্ষের ভাষায়, এটি শুধু রান্নার আগুন নয়—এই আগুন নিভে গেলে শতাব্দীপ্রাচীন ইটের কাঠামোতে ফাটল ধরতে পারে। তাই কঠিন সময়েও ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করেনি বোতিন।

বোতিনকে ঘিরে রয়েছে শিল্প ও সাহিত্যের নানা কিংবদন্তি, যা এর আবেদনকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। লোকমুখে শোনা যায়, অষ্টাদশ শতকের বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী ফ্রান্সিসকো গোয়া তার যৌবনে জীবিকার সন্ধানে মাদ্রিদে এসে এই রেস্তোরাঁতেই মালবাহক হিসেবে কাজ করেছিলেন। যদিও এর পক্ষে সরাসরি লিখিত প্রমাণ নেই, তবে গল্পটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বোতিনের ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

অন্যদিকে, আধুনিক সাহিত্যের কিংবদন্তি আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে বোতিনের সম্পর্ক আরও স্পষ্ট। হেমিংওয়ে তার উপন্যাস দ্য সান অলসো রাইজেস-এর শেষ দৃশ্যটি লেখার সময় বোতিনের দ্বিতীয় তলার একটি নির্জন টেবিল বেছে নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি তার বই ডেথ ইন দ্য আফটারনুন-এ বোতিনকে মাদ্রিদের সেরা রেস্তোরাঁগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন। এসব কারণে বোতিন শুধু খাবারের জায়গা নয়, বরং সাহিত্যপ্রেমীদের কাছেও এক ধরনের তীর্থস্থান।

স্থাপত্যের দিক থেকে বোতিন যেন এক জীবন্ত জাদুঘর। ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে মোটা দেয়াল, কাঠের বিম আর পাথরের খিলান। নিচতলার মদের সেলারটি এই ভবনের সবচেয়ে পুরোনো অংশ। স্যাঁতসেঁতে বাতাস, ধুলোবালি মাখা মদের বোতল আর মৃদু আলোয় জায়গাটি মনে করিয়ে দেয় কয়েক শতাব্দী আগের ইউরোপকে। ইতিহাস বলছে, উনিশ শতকের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় এই সেলার থেকে একটি গোপন সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে অনেক উদারপন্থি ইনকুইজিশন ও সরকারের নজর এড়িয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।

তবে বোতিনের আসল প্রাণ হলো এর বিশাল গ্রানাইট পাথরের উনুন। এটি শুধু একটি রান্নার যন্ত্র নয়, বরং রেস্তোরাঁটির হৃদপিণ্ড। এই উনুনেই প্রতিদিন কাঠের আগুনে রোস্ট করা হয় কচি শুয়োর ও ভেড়া। হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২০ হাজার সাকলিং পিগ এই উনুনে সেঁকা হয়। আগুনের তাপ, কাঠের ধোঁয়া আর ধীরগতির রান্না—সব মিলিয়ে যে স্বাদ তৈরি হয়, তা বোতিনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

খাবারের দিক থেকে বোতিন বরাবরই সরলতায় বিশ্বাসী। আধুনিক ‘মলিকুলার গ্যাস্ট্রোনমি’ বা জটিল ফিউশন রান্নার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ নেই। বর্তমান সহ-মালিক ও তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি আন্তোনিও গঞ্জালেজের মতে, বোতিন টিকে আছে তার শিকড়ের কারণে। তাদের মেনুতে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ ‘সাকলিং পিগ’ বা কচি শুয়োরের রোস্ট। মাত্র কয়েক সপ্তাহ বয়সী শুয়োরকে লবণ ও নিজস্ব চর্বি দিয়ে মাখিয়ে মাটির পাত্রে দুই থেকে তিন ঘণ্টা ধরে রোস্ট করা হয়। ফলাফল—বিস্কুটের মতো মচমচে চামড়া আর ভেতরে মাখনের মতো নরম মাংস।

এ ছাড়া ‘হুয়েভোস রেভ্যুল্টোস’, ‘কর্ডেরো আসাদো’ বা ভেড়ার রোস্ট এবং শেষে ঘরোয়া ধাঁচের ‘তার্তা দে কুয়েসো’—সবকিছুতেই বোতিনের ঐতিহ্য স্পষ্ট। এখানে খাবার মানে শুধু পেট ভরানো নয়, বরং একটি সময়কে অনুভব করা।
তিন শতাব্দীতে বোতিনের অতিথি তালিকাও হয়েছে সমৃদ্ধ। স্পেনের রাজপরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, লেখক ও শিল্পীরা এখানে খেতে এসেছেন। জর্ডানের রাজা হোসেন, জ্যাকি কেনেডি, হেনরি কিসিঞ্জার থেকে শুরু করে হলিউড তারকা আন্তোনিও বান্দেরাস কিংবা ক্যাথরিন জেটা-জোনস—সবারই নাম জড়িয়ে আছে বোতিনের ইতিহাসে। তবে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষের মতে, তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেই সাধারণ অতিথিরা, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই স্বাদের টানে এখানে ফিরে আসেন।

প্রায় একশ কর্মী নিয়ে বোতিনের দৈনন্দিন কার্যক্রম চলে সুশৃঙ্খলভাবে। নতুন কর্মীরা এখানে কাজ শিখতে এসে বছরের পর বছর ধরে রেস্তোরাঁটির আদব-কায়দা রপ্ত করেন। রান্নাঘরে কোনো উপকরণ ঢোকার আগে মালিকপক্ষের কঠোর যাচাই হয়। এই কঠোর মাননিয়ন্ত্রণই বোতিনকে তিন শতাব্দী ধরে প্রাসঙ্গিক রেখেছে।

৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বোতিন কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়েছে। নতুন লোগো, আধুনিক ওয়েবসাইট আর ডিজিটাল উপস্থিতি বাড়ালেও মূল দর্শনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আন্তোনিও গঞ্জালেজের ভাষায়, এই আগুন যেন প্রমিথিউসের কাছ থেকে ধার নেওয়া—যা কোনোভাবেই নিভতে দেওয়া যাবে না। বোতিনের ইতিহাস প্রমাণ করে, সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু কিছু স্বাদ আর কিছু আগুন শতাব্দীর পর শতাব্দী একইভাবে জ্বলে উঠতে পারে।

সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন

Read Previous

ভদ্রপুর বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বুদ্ধ এয়ারের বিমান রানওয়ে ছাড়িয়ে যায়, অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়াল

Read Next

মালে–ঢাকা সরাসরি ফ্লাইটে নতুন সম্ভাবনা, বাংলাদেশ–মালদ্বীপ পর্যটনে গতি ফিরছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular