
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক/সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: টাঙ্গুয়ার হাওর—বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনন্য জলজ সৌন্দর্যের আধার। প্রতিদিন শত শত পর্যটক এখানে ভিড় করেন প্রকৃতির ছোঁয়া নিতে। তবে সম্প্রতি এই অপরূপ হাওর যেন পর্যটনের চাপেই হুমকির মুখে। তীরবর্তী গ্রামগুলোর মানুষ এখন গলার জোরে বলছেন—”এই পর্যটন আমাদের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে, রক্ষা করো আমাদের হাওরকে।”
শনিবার জয়পুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় এক ব্যতিক্রমী মতবিনিময় সভা। আয়োজন করে পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা। এতে অংশ নেয় হাওরের আশেপাশের শতাধিক মানুষ। সভার প্রতিটি বক্তব্যে উঠে আসে—টাঙ্গুয়ার হাওরে অপরিকল্পিত পর্যটনের বিরুদ্ধে এক গভীর ক্ষোভ।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন নৌকায় আগত পর্যটকদের উচ্চ শব্দে বাজানো গান, মাইকের চিৎকার, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং কাচের বোতল ছুঁড়ে ফেলা যেন এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। শিশুদের পড়াশোনা, অসুস্থদের বিশ্রাম এবং বৃদ্ধদের শান্তিপূর্ণ জীবন—সবই বিঘ্নিত হচ্ছে এই হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ‘বিকৃত পর্যটনচাপ’-এ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ইঞ্জিনচালিত নৌকার দাপট। শব্দদূষণ, পানিদূষণ, ও তীরের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসে এর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। স্থানীয়রা বলছেন, মূল হাওরে ইঞ্জিনচালিত নৌকার প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। তাদের বিকল্প প্রস্তাব—হাতে চালিত নৌকায় পর্যটন ব্যবস্থা চালু করা হোক, যাতে পরিবেশ যেমন বাঁচে, তেমনি কর্মসংস্থানের পথও খুলে যায় স্থানীয়দের জন্য।
এই সভায় প্রথমবারের মতো স্থানীয় জনগোষ্ঠী এক কণ্ঠে উচ্চারণ করেন—পর্যটন হবে আমাদের অধিকারভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব এবং পরিকল্পিত। এর বাইরে কিছুই গ্রহণযোগ্য নয়।
এমন বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো সংবেদনশীল এলাকার জন্য ‘ভিলেজ-ভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম’ মডেল চালু করা দরকার, যেখানে স্থানীয়রাই হবেন পর্যটন ব্যবস্থার চালিকাশক্তি।
এখন সময় এসেছে পর্যটনকে শুধু অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে না দেখে, একে পরিবেশ ও সমাজের ভারসাম্য রক্ষার একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করার। টাঙ্গুয়ার হাওরের ডাক এখন আর কেবল প্রকৃতির রূপ নয়, এটি এক প্রতিরোধের প্রতিধ্বনি।
পর্যটনের নামে প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান ভেঙে দেওয়া চলবে না—এই বার্তা যেন এবার পৌঁছে যায় নীতিনির্ধারকদের দরজায়।



