১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ্যামলীতে চাঁদাবাজির অভিযোগে সাবেক যুবদল নেতা মঈন উদ্দিন গ্রেফতার: র‍্যাবের অভিযানে উঠে এল দীর্ঘদিনের ভয়ের চিত্র

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় চাঞ্চল্যকর চাঁদাবাজির ঘটনায় সাবেক যুবদল নেতা মঈন উদ্দিন ওরফে মঈনকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকালে র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেন। গ্রেফতারের সময় মঈনের সঙ্গে তার আরও ছয় সহযোগীকে আটক করা হয়েছে। মোট সাতজনকে গ্রেফতারের পর তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে র‍্যাব।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১১ এপ্রিল। শ্যামলীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি (সিকেডি) হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার ইনচার্জ আবু হানিফ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেন। মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে সাবেক যুবদল নেতা মঈন উদ্দিন মঈনকে। এজাহারে বাদী উল্লেখ করেছেন, মঈন ও তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় তারা বাদী ও তাঁর পরিবারকে নানা ধরনের ভয়-ভীতি ও হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন।

গত ১০ এপ্রিল সকালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শেরেবাংলা নগর থানাধীন শ্যামলী ৩ নম্বর রোডে বাদীর বাসার সামনে এসে মঈন ও তার সহযোগীরা দরজা খুলতে বলেন। বাদীর স্ত্রী দরজা খুললে মঈন সরাসরি জানান, চাঁদা বাবদ তাৎক্ষণিকভাবে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। অন্যথায় বাদী ও তাঁর স্ত্রীর ক্ষতি করা হবে বলে স্পষ্ট হুমকি দেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অভিযুক্তরা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ শুরু করেন এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করে পরিবেশ অশান্ত করে তোলেন। বাদী পরিস্থিতি বুঝে বাসার অন্য একটি কক্ষে আশ্রয় নেন এবং হাসপাতালে অবস্থানরত তাঁর ছোট ভাইকে বিষয়টি জানান।

ছোট ভাই বাসায় পৌঁছানোর পর মঈনসহ অজ্ঞাতনামা ৭-৮ জন আসামি ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে আশপাশের লোকজন জড়ো করতে থাকেন। একপর্যায়ে তারা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন লোক সমবেত করে সিকেডি হাসপাতালের সামনে চলে আসেন। সেখানে তারা উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেন, উচ্চস্বরে স্লোগান দেন, গালাগালি করেন এবং হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালান। ঘটনাটি পুরো এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এ ধরনের ঘটনা শ্যামলীতে নতুন নয়, তবে হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এমন চাঁদাবাজি এলাকাবাসীকে ভয়ের মধ্যে রেখেছে।

র‍্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চাঁদাবাজির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি উঠে এসেছে। মঈন উদ্দিনকে এলাকায় ‘কুখ্যাত চাঁদাবাজ’ হিসেবে পরিচিতি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে জড়িত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। সিকেডি হাসপাতালটি রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিডনি চিকিৎসা কেন্দ্র। প্রতিদিন শত শত রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালের সামনে এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল। চিকিৎসক ও কর্মকর্তারা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু হাসপাতালের পরিবেশ নষ্ট করে না, বরং জনস্বাস্থ্য সেবাকেও ব্যাহত করে।

র‍্যাবের মিডিয়া উইং জানিয়েছে, গ্রেফতারকৃত সাতজনকে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হুমকি, জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মামলা চলমান রয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাদের রিমান্ডে নিয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, মামলাটির তদন্তে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনা ঘিরে শ্যামলী এলাকায় স্বস্তির হাওয়া বইছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাঁদাবাজির ভয়ে অনেকেই নীরবে সহ্য করে যেতেন। এবার র‍্যাবের দ্রুত অভিযান তাদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ গ্রেফতারকে সাধুবাদ জানিয়ে অনেকে লিখেছেন, ‘এলাকা থেকে চাঁদাবাজির শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে।’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও র‍্যাবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। তারা জানিয়েছে, এখন থেকে হাসপাতালের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হবে যাতে রোগী ও চিকিৎসকরা নির্বিঘ্নে সেবা দিতে ও নিতে পারেন।

ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কিছু ব্যক্তি এ ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে র‍্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে অনেক চাঁদাবাজ গ্রেফতার হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে। মঈন উদ্দিনের গ্রেফতার এই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু গ্রেফতার করলেই চাঁদাবাজির মূলোৎপাটন সম্ভব নয়। প্রয়োজন স্থায়ী নজরদারি, দ্রুত বিচার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সিকেডি হাসপাতালের এ ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করেছে যে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও চাঁদাবাজির টার্গেট বানানো হচ্ছে। এতে রোগীদের সেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং চিকিৎসক-কর্মকর্তারা মানসিক চাপে পড়ছেন।

র‍্যাব কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। মঈন উদ্দিন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। শ্যামলীবাসী এখন প্রত্যাশা করছে, এ গ্রেফতারের পর এলাকায় চাঁদাবাজির ভয় আর ফিরে আসবে না। হাসপাতালের সামনে শান্ত পরিবেশ ফিরে আসুক এবং রোগীরা নির্ভয়ে চিকিৎসা নিতে পারুক—এটাই সবার কামনা।

Read Previous

বাংলাদেশে হজ ব্যবস্থাপনায় নতুন মাইলফলক: প্রথমবারের মতো নুসুক কার্ড বিতরণ শুরু

Read Next

বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা দরজা আবার খুলছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular