১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে নতুন অধ্যাদেশ: যাত্রী সেবা উন্নয়নের পাশাপাশি ভাড়া নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা

ছবি: প্রতীকী

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি ‘বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে, যা যাত্রীদের সেবা নিশ্চিতকরণ, টিকিটিং ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনয়ন এবং বিমান ভাড়াকে যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার লক্ষ্য নিয়ে প্রণীত হয়েছে। এই অধ্যাদেশটি ২০১৭ সালের মূল আইনের ব্যাপক সংস্কারের ফলস্বরূপ তৈরি করা হয়েছে এবং গত ২ জানুয়ারি আইন মন্ত্রণালয়ের গেজেটে প্রকাশিত হয়। সংশোধিত আইনে যাত্রীদের নিরাপত্তা, সুবিধা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাকে বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আইনি দায়িত্ব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা এখনকার ডিজিটাল যুগে যাত্রীদের অধিকার রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এছাড়া, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সার্ভিস প্রোভাইডার, টিকিট বিতরণ চ্যানেল এবং সাধারণ বিক্রয় প্রতিনিধি (জিএসএ) এর মতো সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংজ্ঞা এবং কার্যপরিধি প্রথমবারের মতো আইনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে আরও নিয়মিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো যাত্রীদের অভিজ্ঞতাকে উন্নত করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে, যেমন টিকিট কেনার প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের লাগাম পরানো।

তবে এই অধ্যাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—বিমান ভাড়ার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ—খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তারা মনে করছেন যে, এই বিধান মুক্তবাজার অর্থনীতির মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক এবং দেশের এভিয়েশন খাতকে দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে, সরকার যদি টিকিটের সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়—যা অর্থনৈতিক পরিভাষায় ‘প্রাইস সিলিং’ নামে পরিচিত—তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে এয়ারলাইন কোম্পানিগুলো নতুন বিনিয়োগ থেকে নিরুৎসাহিত হবে, বিমান বহরের সম্প্রসারণ কমে যাবে এবং নতুন রুট চালুর প্রবণতা হ্রাস পাবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, সক্ষমতার অভাবে শেষ পর্যন্ত টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্যও বেড়ে যেতে পারে, যা যাত্রীদের জন্য উল্টো অসুবিধা সৃষ্টি করবে। এই নিয়ন্ত্রণের ফলে কম লাভজনক বা মার্জিনাল রুটগুলোতে ফ্লাইট চালানো বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যার ফলে দেশের আকাশপথের সংযোগ কমে যাবে এবং সামগ্রিক যাত্রী সেবার মান হ্রাস পাবে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখন বিমান ভাড়া নির্ধারণে এয়ারলাইনগুলোকে পূর্ণ বাণিজ্যিক স্বাধীনতা প্রদান করে, যা প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে ভাড়াকে স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের ‘ওপেন স্কাই’ চুক্তিতেও ভাড়া নির্ধারণে এই স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়েছে, যা নতুন অধ্যাদেশের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হচ্ছে।

অধ্যাদেশ অনুসারে, বিমান ভাড়া এবং অন্যান্য চার্জ নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের ‘উপদেষ্টা পর্ষদ’ গঠন করা হবে। এই পর্ষদ দেশীয় এবং বিদেশি এয়ার অপারেটরদের জন্য ফি, চার্জ, রয়্যালটি এবং ভাড়ার হার নির্ধারণে সরকারকে সুপারিশ প্রদান করবে। এছাড়া, এয়ার অপারেটরদের সকল রুটের সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ ভাড়ার তালিকা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে, এবং কোনো রুটে কৃত্রিম সংকট বা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেলে কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। এই ব্যবস্থা যাত্রীদের সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও, খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন যে, এমন প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে এয়ারলাইনগুলোর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে বাধাগ্রস্ত করবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ভাড়া সীমিত করা হয়, তাহলে এয়ারলাইনগুলো লোকসান এড়াতে কম গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো বন্ধ করে দিতে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক সংযোগকে দুর্বল করবে। এছাড়া, নতুন বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে যাবে, কারণ মুক্তবাজারে ভাড়া চাহিদা এবং সরবরাহের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, যা লাভের সম্ভাবনা বাড়ায়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক পরিচালনা পর্ষদ সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম এই অধ্যাদেশের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বিধানকে মুক্তবাজার অর্থনীতির নীতির পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, বিশ্বব্যাপী এয়ারলাইনগুলো ভাড়া নির্ধারণ করে চাহিদা এবং সরবরাহের ভিত্তিতে, যেখানে চাহিদা বাড়লে ভাড়া বৃদ্ধি পায় এবং চাহিদা কমলে তা হ্রাস পায়। অনেক সময় এয়ারলাইনগুলোকে লোকসান সত্ত্বেও ফ্লাইট চালু রাখতে হয়, যাতে বাজারে তাদের উপস্থিতি বজায় থাকে এবং ভবিষ্যতের ব্যবসা সুরক্ষিত হয়। কাজী ওয়াহিদুল আলম আরও জানান যে, এয়ারলাইনগুলো ‘ইয়েল্ড ম্যানেজমেন্ট’ পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিটি রুটের ভাড়া নির্ধারণ করে, যেখানে আয়, ব্যয় এবং বিনিয়োগের রিটার্ন বিবেচনা করা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি আসনের মূল্য বিভিন্ন সময় এবং পরিস্থিতি অনুসারে পরিবর্তিত হয়। সরকার যদি ভাড়া নির্দিষ্ট করে বেঁধে দেয়, তাহলে তা এয়ারলাইনগুলোর বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হবে, যা খাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এমন নিয়ন্ত্রণের ফলে বিদেশি এয়ারলাইনগুলো বাংলাদেশে ফ্লাইট চালানোয় আগ্রহ হারাতে পারে, যা দেশের এভিয়েশন খাতকে আরও পিছিয়ে দিতে পারে।

নতুন অধ্যাদেশে বিদেশি এয়ারলাইনগুলোর কার্যক্রমের ওপরও অতিরিক্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, যা খাতে আরও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো বিদেশি এয়ারলাইন বাংলাদেশে কার্যক্রম চালাতে চাইলে তাকে নিজস্ব কার্যালয় স্থাপন করতে হবে বা শতভাগ বাংলাদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে জিএসএ হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়া, কোনো এয়ার অপারেটর সরাসরি ট্রাভেল এজেন্সি ব্যবসা বা জিএসএ হিসেবে কাজ করতে পারবে না। সরকারের দাবি যে, এতে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা কমবে এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হবে। কিন্তু এয়ারলাইনগুলোর মতে, এই বিধান পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেবে এবং ব্যবসায়িক নমনীয়তা হ্রাস করবে, যা বিদেশি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করতে পারে। ফলে, বাংলাদেশের এয়ারপোর্টগুলোতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা কমে যেতে পারে, যা পর্যটন এবং ব্যবসায়িক যাত্রীদের জন্য অসুবিধাজনক হবে।

এছাড়া, অধ্যাদেশে টিকিট বিক্রির ডিজিটাল মাধ্যমগুলো—যেমন অ্যাপ, ওয়েব পোর্টাল এবং গ্লোবাল ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম—কে কর্তৃপক্ষের নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে। এসব চ্যানেলে আসন ব্লকিং বা কৃত্রিম সংকট রোধ করার জন্য চেয়ারম্যানকে রিয়েল-টাইম অ্যাকসেস দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে, এবং জনস্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ প্রমাণিত হলে নিবন্ধন বাতিল বা স্থগিত করা যাবে। এই ব্যবস্থা টিকিটিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সাহায্য করলেও, খাতসংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন যে, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে এবং যাত্রীদের আধুনিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, বিশেষ করে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) থেকে। সংস্থাটি গত জানুয়ারিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে পাঠানো একটি চিঠিতে জানিয়েছে যে, অধ্যাদেশের ধারা ৪৩এ-এর ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মুক্তবাজার অর্থনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে এভিয়েশন খাতে নিয়ন্ত্রণমুক্ত ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী বিমান ভাড়া প্রকৃত অর্থে অর্ধেকেরও বেশি কমেছে, যা প্রতিযোগিতার ফল। আইএটিএ সতর্ক করে বলেছে যে, এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে যাত্রীদের পছন্দ সীমিত হবে, বিমান সংযোগ কমে যাবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সংস্থাটি সরকারকে বিধানগুলো পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে, যাতে এয়ারলাইনগুলোর ভাড়া নির্ধারণের স্বাধীনতা বজায় রেখে একটি শক্তিশালী এবং প্রতিযোগিতামূলক বিমান পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়।

সার্বিকভাবে, যাত্রী সেবা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের উদ্যোগগুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও, ভাড়া নিয়ন্ত্রণের মতো বিধানগুলো খাতের বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। নতুন রুট চালু এবং বিমান বহর সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হলে যাত্রী সেবার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা উল্টো ফল দিতে পারে। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে, সরকারের উচিত আইএটিএ-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সুপারিশ বিবেচনা করে অধ্যাদেশটিকে পুনর্বিবেচনা করা, যাতে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত বিশ্বমানের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। এই অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ প্রভাব দেখার জন্য সকলে অপেক্ষায় রয়েছেন, কারণ এটি দেশের পর্যটন, ব্যবসা এবং যাতায়াত ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করবে।

Read Previous

যুক্তরাজ্যে ভ্রমণের নতুন যুগ: ৮৫ দেশের পর্যটকদের জন্য ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ETA) বাধ্যতামূলক

Read Next

আসন্ন ঈদুল ফিতরে আকাশপথে যাত্রীদের চাপ: টিকিটের দাম বাড়ার আশঙ্কা তীব্র, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে প্রভাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular