২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাজ্যে ভ্রমণের নতুন যুগ: ৮৫ দেশের পর্যটকদের জন্য ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ETA) বাধ্যতামূলক

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছে যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করতে চলেছে। এই নতুন নিয়ম অনুসারে, ৮৫টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশের জন্য একটি ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ETA) নামক পারমিট নিতে হবে। এটি ছাড়া ভ্রমণকারীদের দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে, যা বিমান সংস্থাগুলিকে যাত্রীদের বিমানে উঠতে বাধা দেওয়ার অধিকার দেয়। এই স্কিমটি যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে চালু করা হয়েছে, যা ভ্রমণকারীদের জন্য একটি ডিজিটাল এবং দক্ষ প্রক্রিয়া প্রদান করবে। ETA-এর মূল্য মাত্র ১৬ পাউন্ড (প্রায় ২১.৫৭ ডলার), এবং এটি অনলাইনে আবেদন করে পাওয়া যাবে। এই নিয়মটি ২০২৩ সালে প্রথম চালু হয়েছিল এবং গত বছরের এপ্রিল মাসে ইউরোপীয় দেশগুলির পর্যটকদের জন্য প্রসারিত করা হয়। তবে, প্রাথমিকভাবে এটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়নি, যা ভ্রমণকারীদের কিছুটা ছাড় দিয়েছিল।

আসন্ন ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এই ETA স্কিমটি সম্পূর্ণরূপে বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে। এর ফলে, যুক্তরাজ্যে যাওয়ার ইচ্ছুক সকল দর্শনার্থীদের, যাদের ভিসার প্রয়োজন নেই, তাদের অবশ্যই এই ইলেকট্রনিক অনুমতিপত্র গ্রহণ করতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, ETA, ই-ভিসা বা অন্য কোনো বৈধ নথিপত্র না থাকলে বিমান সংস্থাগুলি যাত্রীদের ফ্লাইটে উঠতে অনুমতি দেবে না। এই নিয়মটি বিশেষ করে সেইসব দেশের নাগরিকদের প্রভাবিত করবে যারা পূর্বে ভিসা-মুক্ত ভ্রমণের সুবিধা উপভোগ করতেন। তবে, ব্রিটিশ এবং আইরিশ নাগরিকরা, যাদের দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে বা যুক্তরাজ্যে বসবাসের অধিকার আছে, তারা এই প্রয়োজনীয়তা থেকে মুক্ত থাকবেন। এই ছাড়টি তাদের জন্য একটি স্বস্তির বিষয়, কারণ এটি তাদের ভ্রমণ প্রক্রিয়াকে জটিলতামুক্ত রাখবে। অভিবাসন মন্ত্রী মাইক ট্যাপ এই স্কিমটিকে যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, “ইটিএ স্কিমটি যুক্তরাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য আমাদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা দর্শনার্থী এবং ব্রিটিশ জনসাধারণ উভয়ের জন্যই কার্যকর একটি আরও দক্ষ এবং আধুনিক পরিষেবা প্রদানে সহায়তা করে।” এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে এই নিয়মটি শুধু নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং ভ্রমণ প্রক্রিয়াকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যেও চালু করা হয়েছে।

এই নতুন স্কিমটি যুক্তরাজ্যের ভ্রমণ নিয়মাবলীতে একটি বড় পরিবর্তন এনে দিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী পর্যটন শিল্পকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে, এশিয়া, আফ্রিকা এবং অন্যান্য অঞ্চলের ৮৫টি দেশের পর্যটকরা এখন থেকে তাদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় এই অতিরিক্ত ধাপটি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ETA আবেদন প্রক্রিয়াটি অনলাইনে সম্পন্ন করা যাবে, যা কয়েক মিনিটের মধ্যে অনুমোদন পেয়ে যায়, কিন্তু এটি না থাকলে ভ্রমণে বাধা পড়তে পারে। এই স্কিমটি যুক্তরাজ্যের সীমান্তে অবৈধ প্রবেশ রোধ করার উদ্দেশ্যে ডিজাইন করা হয়েছে, যা সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে দেশকে রক্ষা করবে। গত বছরের অক্টোবর মাসে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)ও ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য অনুরূপ সীমান্ত নিরাপত্তা চেক চালু করেছে। ২০২০ সালে ব্রিটেন ইইউ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পর এই পরিবর্তনগুলি ধীরে ধীরে কার্যকর হচ্ছে। ইইউর প্রবেশ/প্রস্থান ব্যবস্থা (EES) পাসপোর্টে ম্যানুয়াল স্ট্যাম্পের পরিবর্তে ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি করে, যা প্রক্রিয়াটিকে আরও দ্রুত এবং সঠিক করে তোলে।

তবে, এই নতুন ব্যবস্থাগুলি চালু হওয়ার ফলে কিছু চ্যালেঞ্জও দেখা দিয়েছে। অনেক ভ্রমণকারী অভিযোগ করেছেন যে ইইউর EES সিস্টেমের কারণে কিছু বিমানবন্দরে দীর্ঘ লাইন এবং বিলম্ব হচ্ছে। শিল্প নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে আসন্ন ইস্টার ছুটির সময়ে এই সিস্টেমের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ব্যাপক ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যা পর্যটন শিল্পের জন্য ক্ষতিকর হবে। যুক্তরাজ্যের ETA স্কিমও অনুরূপ সমস্যা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যদি ভ্রমণকারীরা এই নিয়ম সম্পর্কে অবগত না হন। পর্যটন বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করছেন যে ভ্রমণকারীরা তাদের যাত্রার অন্তত ৭২ ঘণ্টা আগে ETA-এর জন্য আবেদন করুন, যাতে কোনো সমস্যা না হয়। এছাড়া, এই স্কিমটি যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, কারণ এটি নিরাপত্তা বাড়িয়ে আরও বেশি পর্যটককে আকর্ষণ করবে।

সামগ্রিকভাবে, এই নতুন নিয়মাবলী বিশ্বব্যাপী ভ্রমণের ল্যান্ডস্কেপকে পরিবর্তন করছে। ব্রেক্সিটের পর থেকে যুক্তরাজ্য এবং ইইউ উভয়ই তাদের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণকে ডিজিটালাইজ করার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা ভ্রমণকারীদের জন্য নতুন অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশসহ এশিয়ান দেশগুলির পর্যটকরা যারা যুক্তরাজ্যে যান, তাদের এখন থেকে এই ETA-কে তাদের ভ্রমণ চেকলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এটি শুধু একটি ফর্মালিটি নয়, বরং নিরাপত্তা এবং দক্ষতার একটি ধাপ। সূত্র হিসেবে ফ্রান্স ২৪-এর রিপোর্ট থেকে এই তথ্যগুলি সংগ্রহ করা হয়েছে, যা এই পরিবর্তনগুলির বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রদান করে। ভবিষ্যতে এই স্কিমটি আরও দেশে প্রসারিত হতে পারে, যা বিশ্ব পর্যটনকে আরও নিয়ন্ত্রিত করে তুলবে।

Read Previous

শিলিগুড়ি-কলকাতার হোটেলে ফিরছে বাংলাদেশি পর্যটক: ১৩ মাসের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ও ঘটনাপ্রবাহ

Read Next

বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে নতুন অধ্যাদেশ: যাত্রী সেবা উন্নয়নের পাশাপাশি ভাড়া নিয়ন্ত্রণের সমালোচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular