১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পিলখানা ট্র্যাজেডির ১৭তম বার্ষিকী: বিজিবিকে বিডিআর নামে পুনর্বহালের প্রক্রিয়া অগ্রসর, নতুন তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিল সরকার

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : আজ ২৫ ফেব্রুয়ারি, রাজধানীর পিলখানায় ২০০৯ সালে সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডের ১৭তম বার্ষিকী। এই দিনটিকে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ঘোষণা করা হয়েছিল। এই শোকাবহ ঘটনায় ৫৭ জন সেনা অফিসারসহ মোট ৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। বর্তমান সরকার, যা বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত, এই ঘটনার স্মৃতি জাগরূক রাখতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ উপলক্ষে একটি বাণী প্রদান করেছেন, যাতে তিনি শহীদদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং ঘটনার পেছনের ষড়যন্ত্র উন্মোচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

নির্বাচনের ঠিক চার দিন আগে, সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিডিআরের নাম এবং ইউনিফর্ম পুনর্বহাল করা হবে। এছাড়া, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে ‘শহীদ সেনা দিবস’, ‘সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবস’ বা ‘জাতীয় শোক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনা ছিল। নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করার পর এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সীমান্ত অনুবিভাগের যুগ্মসচিব রেবেকা খান জানিয়েছেন, বিজিবিকে বিডিআর নামে পরিবর্তনের নীতিগত সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে। তবে ফাইল প্রক্রিয়াকরণের কাজ এখনও শুরু হয়নি। তিনি বলেন, ‘সরকার গঠনের পরপরই এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। বিজিবি বা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে চাহিদা এলেই কাজ এগোবে।’ এই পরিবর্তনটি মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বিডিআরের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে স্মরণ করিয়ে দেবে।

পিলখানা ট্র্যাজেডির পেছনের রহস্য উন্মোচনের জন্য বর্তমান সরকার নতুন তদন্তের ঘোষণা করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত সোমবার জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’-এর রিপোর্টে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততা এবং প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের ভূমিকা উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়েছে, তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এছাড়া, ভারতের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে। কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেন, এই হত্যাকাণ্ড সেনাবাহিনীকে দুর্বল করার এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছে। শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবরের জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। তবে বর্তমান সরকার এই রিপোর্টে পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছে না, তাই নতুন তদন্তের মাধ্যমে সত্য উন্মোচন করতে চায়।

গত বছরের এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছিলেন, এই হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণভাবে তত্কালীন বিডিআর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত, এখানে কোনো ‘ইফ’ বা ‘বাট’ নেই। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ঘটনার বিচারিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা উচিত নয়, কারণ এতে ১৬-১৭ বছর ধরে চলমান বিচার এবং দোষীদের শাস্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। যারা শাস্তি পেয়েছে, তারা যোগ্যতা অনুসারে পেয়েছে। তবে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) মইন ইউ আহমেদ এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, তদন্তে সরকারের সহায়তা ছিল না, এবং ষড়যন্ত্রের পেছনের কথা তিনি উল্লেখ করেননি। এই মতভেদগুলো নতুন তদন্তের মাধ্যমে সমাধান করার আশা করা হচ্ছে।

ঘটনার দিন, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, বিডিআরের বার্ষিক দরবার চলাকালীন বিদ্রোহ শুরু হয়। সকাল ৯টা ২৬ মিনিটে দুজন বিদ্রোহী জওয়ান মঞ্চে উঠে আক্রমণ শুরু করে। দরবার হলে উপস্থিত ছিলেন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ অনেক কর্মকর্তা। বিদ্রোহীরা গুলি চালিয়ে কর্মকর্তাদের হত্যা করে, এবং পরবর্তীতে লাশগুলো পুঁতে ফেলে। ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় তারা অস্ত্র সমর্পণ করে। এই ঘটনা দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে সংঘটিত হলেও, পেছনে গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি তদন্ত অনুসারে, দরবারে ২ হাজার ৫৬০ জন উপস্থিত ছিলেন।

এই দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে শহীদদের স্মরণে প্রার্থনা সভা, আলোচনা অনুষ্ঠান এবং পরিবারের সদস্যদের সহায়তা প্রদান। সরকারের এই উদ্যোগগুলো দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মনোবল বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, রাজনৈতিক মতভেদের কারণে এই ঘটনা এখনও বিতর্কিত। আওয়ামী লীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে তারা বলছে, এটি বিডিআর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের ফল। নতুন তদন্তের মাধ্যমে সত্য উন্মোচিত হলে এই বিতর্কের অবসান হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, পিলখানা ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। বিএনপি সরকারের অধীনে এই ঘটনার পুনর্বিবেচনা এবং বিডিআরের পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। শহীদদের পরিবারগুলো এখনও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে, এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণ হলে তাদের ক্ষত কিছুটা লাঘব হতে পারে। এই দিবসটি শুধু শোকের নয়, বরং সতর্কতা এবং ঐক্যেরও প্রতীক হয়ে উঠেছে।

Read Previous

মালদিভিয়ান এয়ারলাইন্স ১২ মার্চ থেকে পুনরায় চালু করছে ঢাকা-মালে সরাসরি ফ্লাইট

Read Next

বালিতে ভারী বৃষ্টিপাতে বন্যা: পর্যটকরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে, কোনো প্রাণহানি নেই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular