যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কে বিপদে রপ্তানি খাত, পর্যটন শিল্পেও পড়তে পারে ছায়া

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানিতে নতুন করে শুল্ক আরোপের পর এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের রপ্তানি খাতে। ওয়ালমার্টের মতো মার্কিন খ্যাতনামা ব্র্যান্ড কার্যাদেশ স্থগিত করায় তৈরি পোশাক শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। শিল্প মালিকরা শঙ্কা করছেন, এই ধাক্কা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শিল্প খাতের পাশাপাশি দেশের পর্যটন খাতেও প্রতিকূল প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি গন্তব্য। বিগত অর্থবছরে দেশটি থেকে প্রায় ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে ৭৫৯ কোটি ডলারই পোশাক খাতের। অতিরিক্ত ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ফলে ১ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক বসতে যাচ্ছে। এতে দেশি রপ্তানিকারকরা মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় আছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বড় বড় তৈরি পোশাক কারখানা, যারা শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে টার্গেট করে গড়ে উঠেছে, তাদের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। এ অবস্থায় হাজারো শ্রমিকের বেকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি শ্রমঘন অঞ্চলগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দা সৃষ্টি করতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ও পর্যটন চাহিদার ওপরও।

এশিয়ান ডাফ গ্রুপ, ইনডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলস, প্যাট্রিয়ট ইকো অ্যাপারেল এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুধু পোশাক নয়, হিমায়িত খাদ্য, চামড়াজাত পণ্য, ব্যাগ, আসবাব ও অন্যান্য অপ্রচলিত পণ্যের ক্ষেত্রেও অর্ডার বাতিল বা স্থগিতের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

মাসুদ অ্যাগ্রো প্রসেসিং ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, “আমরা যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি করছিলাম। কিন্তু এখন প্যাকিং কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বলছে বায়াররা। এটা আমাদের ব্যবসার জন্য দুঃসংবাদ।”

পর্যটন খাতে পরোক্ষ প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পখাতে কর্মসংস্থান হ্রাস পেলে তা দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটনে ব্যয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তারা দেশজুড়ে যেসব গন্তব্যে ভ্রমণ করেন বা স্থানীয় পর্যটনে অংশ নেন, সেই খাতে চাহিদা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, “যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, তারা যেসব দেশে বেশি রপ্তানি করতে পারবে, তাদের জন্য শুল্কসুবিধা দেবে। বাংলাদেশকে তাই শুধু আলোচনার মাধ্যমে নয়, আমদানি বাড়ানোর দিকেও নজর দিতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা সয়াবিন, তুলা, গমসহ আমদানিযোগ্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দিকে নজর দিতে পারি, তবে অহেতুক দামি ও অলাভজনক পণ্য যেমন বোয়িং কেনা উচিত হবে না।”

আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত এবং ফলপ্রসূ আলোচনায় যাওয়া, যাতে শুল্কহার প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে বেশি না হয়। পাশাপাশি বিকল্প বাজার তৈরির উদ্যোগও চালিয়ে যেতে হবে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের মতো সম্ভাবনাময় বাজার হারানো যাবে না। এটা শুধু রপ্তানি নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যা পর্যটন খাতেও ছায়া ফেলতে পারে।”

সংক্ষেপে:

  • যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকসহ পণ্যে ৫০% শুল্ক
  • অর্ডার হারাচ্ছে শতাধিক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান
  • ঝুঁকিতে ৮০০+ প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থানে অনিশ্চয়তা
  • অর্থনৈতিক সংকট পর্যটন খাতেও ফেলতে পারে প্রভাব
  • বিকল্প বাজার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ওপর জোর

Read Previous

সাউথএন্ড বিমানবন্দরে উড্ডয়নের পরই বিধ্বস্ত ছোট উড়োজাহাজ, অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ বিমানবন্দর

Read Next

সোনাখালি রেলক্রসিংয়ে ট্রাক আটকে তিন ঘণ্টা বন্ধ ছিল ট্রেন চলাচল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular