
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশি মোটরসাইকেল ভ্রমণকারীদের দুনিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মুসদাক চৌধুরী। ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে দুই চাকার মোটরসাইকেলে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবের মক্কা পর্যন্ত ১৩ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ অতিক্রম করে তিনি শুধু নিজের স্বপ্নই পূরণ করেননি, বরং বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সাহস, বিশ্বাস আর দৃঢ়তার অনন্য গল্প।
দশ দেশের পথ পাড়ি দিয়ে অসাধারণ অভিজ্ঞতা
মুসদাক ও তার স্ত্রী ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, সৌদি আরব এবং বাহরাইন—মোট দশটি দেশ পাড়ি দিয়েছেন। মোটরসাইকেলের স্বাধীন যাত্রা তাদেরকে প্রতিটি দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, সংস্কৃতি ও মানুষের কাছাকাছি পৌঁছে দিয়েছে।
যেখানেই তারা থেমেছেন, বাংলাদেশি নম্বর প্লেটের মোটরসাইকেল দেখেই মানুষের কৌতূহল জেগে উঠেছে। কথোপকথন শুরু হয়েছে, গড়ে উঠেছে নতুন বন্ধুত্ব। প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়েছেন, অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
পাকিস্তান সীমান্তে এক ব্যতিক্রমী সম্মান
যাত্রার অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত ছিল পাকিস্তান সীমান্তে। সাধারণত যেই গেট খোলা হয় না, বাংলাদেশের প্রতি সম্মানের কারণে সেই গেট খুলে দেওয়া হয় মুসদাকের জন্য। এক রেঞ্জারের কথায় তিনি আজও অভিভূত—
“আমরা সাধারণত এই গেট খুলি না। কিন্তু আপনি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, তাই আমরা অনুমতি দিচ্ছি।”
এই মন্তব্য শুধু তার যাত্রাকে বিশেষ করে তোলেনি, বরং দুই দেশের মানুষের সৌহার্দ্যের এক নিদর্শন হয়ে উঠেছে।
পথে চুরি, ভাষাগত বাধা ও মানুষের সহায়তা
দীর্ঘ ভ্রমণে চ্যালেঞ্জও এসেছে। এক পর্যায়ে তাদের হোস্টের বাড়ি থেকে ফোন চুরি হয়ে যায়। ভাষার কারণে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে স্থানীয় যুবকেরা এগিয়ে এসে পুলিশের সহযোগিতার পথ তৈরি করে দেন।
সহযাত্রীরা মুসদাকের ধৈর্য, ভদ্রতা ও কূটনৈতিক বোঝাপড়ার বিশেষ প্রশংসা করেছেন। তারা বলেন, তিনি কেবল দক্ষ বাইকার নন, বরং আন্তঃসীমান্ত ভ্রমণের জন্য যে মানসিক স্থিরতা দরকার—তা তার মধ্যে স্পষ্ট।
কাগজপত্রের জটিলতা ও সংস্কারের দাবি
পাসপোর্ট, ভিসা, কার্নেট ডি প্যাসেজ, ভ্রমণ কর এবং এনবিআরের বিশেষ অনুমতি—সব মিলিয়ে দীর্ঘ কাগজপত্রের প্রক্রিয়া ছাড়া এ ধরনের ভ্রমণ সম্ভব নয়। কাস্টমস মোটরসাইকেলকে রপ্তানিযোগ্য পণ্য হিসেবে বিবেচনা করায় জটিলতা আরও বাড়ে।
মুসদাক মনে করেন, বাংলাদেশের রাইডারদের জন্য এসব প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। তার মতে, নেপাল বা ভুটানে যেতে ভারতীয় রাইডাররা যেভাবে সুবিধা পান, বাংলাদেশি রাইডারদেরও তেমন সুবিধা প্রাপ্য। তিনি সরকারের কাছে কূটনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করা ও ভ্রমণ অনুমতি সহজ করার আহ্বান জানান।
নতুন অভিযানের অপেক্ষা
ওমরাহ যাত্রা শেষ হলেও মুসদাকের স্বপ্ন এখানে থেমে নেই। সামনে তিনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মোটরসাইকেল ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন। তার এই অভিযাত্রা বাংলাদেশি তরুণদের নতুন করে উৎসাহ দিচ্ছে, দেখাচ্ছে—ইচ্ছা থাকলে পথ নিজেই তৈরি হয়।
মুসদাক চৌধুরীর যাত্রা শুধু একটি মোটরসাইকেল ভ্রমণ নয়। এটি সাহস, মানবিকতা, সম্মান আর বন্ধুত্বের এক চলমান গল্প। এই রাইডার দেখিয়ে দিয়েছেন—বাংলাদেশিরা সীমান্ত ছাড়িয়ে বিশ্বে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে পারে অনন্য মর্যাদায়।



