১৭/০৪/২০২৬
৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা বিমানবন্দরের ভল্ট লুট: অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তা শূন্য, তদন্তে জটিলতা

ঢাকা বিমানবন্দরের ভল্ট লুট: অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তা শূন্য, তদন্তে জটিলতা

ছবি : সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের দশ দিন পর ঘটে যায় এমন এক লুট—যা শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ করেনি, বরং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অদক্ষতা ও দায়সারাভাবও সামনে এনে দিয়েছে। ২৮ অক্টোবর গভীর রাতে অপরাধীরা স্ট্রং রুমে ঢুকে সোনা, হীরা, অস্ত্রসহ নানা উচ্চমূল্যের পণ্য গায়েব করে দেয়। ঘটনার পর দুই সপ্তাহ পার হলেও মামলার কোনও অগ্রগতি নেই, এমনকি কোন সংস্থা কোন দায়িত্ব নেবে—এমনটিও স্পষ্ট নয়।

অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই ভল্ট অরক্ষিত ছিল

১৮ অক্টোবরের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কার্গো টার্মিনালের অনেক অংশ পুড়ে গেলেও ভল্ট অক্ষত ছিল। আগুন নেভার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জরুরি চিঠিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে জানায়—ভল্টের কাঠামো ঠিক থাকলেও সেটি ঝুঁকিপূর্ণভাবে অরক্ষিত। তারা কাস্টমসকে অনুরোধ করেছিল মূল্যবান জিনিসপত্র দ্রুত হেফাজতে নিতে।

কিন্তু কাস্টমস বলছে, সেই সতর্কবার্তা তাদের কাছে কখনও পৌঁছায়নি। ফলে ভল্টে যা ছিল, সবই আগের মতোই পড়ে ছিল—কেউ পাহারা দিচ্ছিল না, আর কোনও নিরাপত্তা প্রটোকলও ছিল না।

কাস্টমস–বিমান: দায় এড়ানোর পাল্টাপাল্টি ব্যাখ্যা

কাস্টমসের যুগ্ম কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান সরাসরি জানান, তাদের কাজ মূলত রাজস্ব আদায়ে সীমাবদ্ধ। মূল্যবান পণ্যের নিরাপত্তা বা ভল্ট পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব তাদের নয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, বিমানের পাঠানো চিঠির বিষয়টি জানতেই পারেননি।

অন্যদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কর্মকর্তারা বলছেন, সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল এবং তাদের দিক থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ছাদের ঝুঁকির কারণে নিরাপত্তাকর্মীদের ভল্ট এলাকার বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের মতে, বিষয়টি ছিল নিরাপত্তাজনিত, ইচ্ছাকৃত নয়।

কিন্তু ঘটনার সময় ভল্ট এলাকাটি পুরোপুরি ফাঁকা থাকা—এটিই investigatorsদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

অপরাধীরা ঢুকল কীভাবে?

চুরির রাতে অপরাধীরা সরঞ্জাম ব্যবহার করে ভল্টের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এটি শুনতে যতটা কঠিন মনে হয়, বাস্তবে ছিল ততটাই সহজ—কারণ ভেতরে কোনও নিরাপত্তা প্রহরী ছিল না, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার অনেকগুলো আগুনে নষ্ট হয়েছিল, আর তদারকিরও অভাব ছিল।

সাধারণত এই ভল্টে থাকে সোনা, হীরা, মূল্যবান ইলেকট্রনিকস, এমনকি লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্রও। গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া নথিতে এসবই নিশ্চিত হয়েছে, যদিও বিমান কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু প্রকাশ করেনি।

মামলা নেই, তালিকাও নেই—তদন্ত স্থবির

অবাক করার মতো ব্যাপার হলো—জিনিসপত্র হারানোর পর এতদিনেও কোনও মামলা দায়ের হয়নি। বিমানবন্দর থানায় কেবল একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে, তাতেও চুরি যাওয়া পণ্যের তালিকা নেই। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষায়—তালিকা না থাকলে কী চুরি গেছে আর কী বাকি আছে, সেটাই জানা যাচ্ছে না।

বিমানবন্দর থানার ওসি তসলিমা আক্তার জানিয়েছেন, বিভিন্ন সংস্থার ডিউটি-তালিকা সংগ্রহ করার জন্য নোটিশ পাঠানো হলেও কেউ থানায় হাজির হননি। তার ভাষায়, এতে তদন্তের সময় নষ্ট হচ্ছে, আর সহযোগিতা না থাকলে তদন্ত এগোনোর সুযোগও থাকছে না।

দায়িত্ব জটিলতায় তদন্তের গতি কমে গেছে

কার্গো টার্মিনালে একাধিক সংস্থা কাজ করে—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, কাস্টমস, সিভিল এভিয়েশন, নিরাপত্তা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। চুরির ঘটনায় কার কে কী দায়িত্ব নেবে এবং কার কাছে কী তথ্য আছে—এ নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেই। এই দায় এড়ানোর প্রবণতা তদন্তকে আরও কঠিন করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অগ্নিকাণ্ডের ঠিক পরপরই ভল্টের নিরাপত্তা জোরদার করা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ঠিক উল্টো—নিরাপত্তা কমেছে, দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো সতর্কতা নেননি, আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে চোরচক্র।

অব্যবস্থাপনার দায় কার?

এখন জনমনে প্রশ্ন—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে এমন বিপুল সম্পদ রেখে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল? সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলো কেন? আগুনের পর নিরাপত্তা সরানো হলো কী কারণে? আর তদন্তে সহযোগিতা না করার কারণই বা কী?

সব মিলিয়ে এই ঘটনা শুধু একটি চুরি নয়—এটি দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা প্রটোকল নিয়ে এক গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিল।

Read Previous

হরিণঘাটা পর্যটনকেন্দ্র ঢলে পড়ছে অবহেলায়: সম্ভাবনার স্বর্গ এখন পর্যটকশূন্য

Read Next

১৩ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মুসদাক চৌধুরীর ওমরাহ যাত্রা: বাংলাদেশি বাইকারের গল্পে মুগ্ধ দশ দেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular