২০/০৬/২০২৬
৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হিজল-করচের ছায়ায় ফিরছে প্রাণ: হাকালুকি হাওরে বন পুনরুদ্ধারের লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার পাঁচটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওর কেবল একটি জলাভূমি নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের জীবন, জীবিকা ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এক বিশাল প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য। আয়তনে এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই মিঠাপানির হাওর একসময় জলজ উদ্ভিদ, মৎস্য ও কৃষির সম্মিলিত ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত ছিল। সময়ের প্রবাহে সেই ভারসাম্য ভেঙেছে। মাছ ও কৃষি টিকে থাকলেও জলজ বন প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।

প্রায় ১৮ হাজার ১৫০ হেক্টর আয়তনের এই হাওরে রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৩৬টি বিল। অসংখ্য খাল এসব বিলকে যুক্ত করেছে একে অপরের সঙ্গে। বর্ষা মৌসুমে সব খাল-বিল একাকার হয়ে বিশাল জলরাশিতে রূপ নেয়, আর শীত এলে পানি নেমে গেলে জেগে ওঠে কৃষিজমি। এই চক্রের ওপর ভর করেই যুগ যুগ ধরে এখানকার মানুষ কৃষি ও মৎস্যনির্ভর জীবন গড়ে তুলেছে।

হাকালুকি হাওর বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ বোরো ও আমন ধান চাষের জন্য। শীতের কনকনে ঠান্ডায় ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকেরা নেমে পড়েন হাওরের কাজে। আবার বর্ষায় পানির নিচে চলে যায় সবকিছু, তখন সেই পানিতেই জন্ম নেয় অসংখ্য দেশীয় মাছ। পানি কমে গেলে মাছ আশ্রয় নেয় বিলগুলোতে, যেগুলো ইজারা দিয়ে সরকার প্রতি বছর বিপুল রাজস্ব আয় করে।

এই জীববৈচিত্র্যের মাঝেই একসময় ছিল ঘন বনাঞ্চল। ৩০ থেকে ৪০ বছর আগেও হাকালুকির বুকে হিজল, করচসহ জলাভূমি উপযোগী গাছের বিস্তৃত বন ছিল। পাহাড়ি জঙ্গলের মতো ঘন সেই বনে বাস করত মেছো বিড়াল, শিয়াল ও নানা প্রজাতির সাপ। গাছের নিচে নিরাপদে ডিম দিত মাছ, ফলে সহজে পোনা নিধন সম্ভব হতো না। কিন্তু হাওর ইজারা ব্যবস্থার আওতায় আসার পর বন কাটা শুরু হয়। ইজারাদাররা মাছ ধরার সুবিধার জন্য এসব গাছ কেটে বিলে কাঁটা হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে ধীরে ধীরে উজাড় হয়ে যায় প্রাকৃতিক বন।

১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে বন উজাড় থামেনি। নানা অজুহাতে গাছ কাটা চলতেই থাকে। শুধু ২০২১ সালেই বাঁধ নির্মাণের নামে একটি বিল থেকে প্রায় ২০ হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়। এর প্রভাব পড়ে মাছের প্রজনন, পাখির আবাস এবং সামগ্রিক পরিবেশের ওপর।

এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) হাকালুকি হাওরের বন পুনরুদ্ধারে এগিয়ে আসে। ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে সংস্থাটি কয়েক বছর ধরে হিজল, করচ ও বরুণসহ জলাভূমি উপযোগী গাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। শুধু গাছ লাগানোতেই সীমাবদ্ধ নয় এই কার্যক্রম; রোপিত গাছ রক্ষায় পাহারাদার নিয়োগ করা হয়েছে, যাতে কেউ সহজে কেটে ফেলতে না পারে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এরই মধ্যে পরিবর্তন চোখে পড়ছে। আগে যেখানে খোলা পানিতে সহজেই জাল ফেলা যেত, এখন সেখানে গাছের উপস্থিতিতে মাছের আশ্রয় তৈরি হচ্ছে। হাওরের সৌন্দর্যও ধীরে ধীরে ফিরছে।

সিএনআরএসের নবপল্লব প্রকল্পের ফিল্ড ম্যানেজার মো. তৌহিদুর রহমান জানান, স্বাধীনতার পর বন বিভাগের আওতা থেকে হাওরের ভূমির দায়িত্ব ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে যাওয়ায় তদারকির অভাব তৈরি হয়। সেই সুযোগে বন কেটে জমি ও মাছ ধরার এলাকা তৈরি করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোতে ইতিবাচক ফল মিলছে এবং পুরনো বন ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠকেরাও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রকৃত সাফল্য আসবে তখনই, যখন আগের মতো বিস্তৃত জলজ বন ফিরে আসবে এবং কোনো অজুহাতে আর কেউ গাছ কাটতে পারবে না।
প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস রয়েছে। কুলাউড়া উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন পুনরুদ্ধারে বেসরকারি উদ্যোগের সঙ্গে সরকার একযোগে কাজ করতে প্রস্তুত। পাহারাদার নিয়োগ ও তদারকিতে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই উদ্যোগ আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হিসেবে হাকালুকি হাওর শুধু একটি অঞ্চলের নয়, পুরো দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। হিজল-করচের ছায়ায় মাছের নিরাপদ প্রজনন, অতিথি পাখির অবাধ বিচরণ এবং মানুষের জীবিকার ভারসাম্য রক্ষাই এই বন পুনরুদ্ধারের মূল লক্ষ্য। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে, হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য আবারও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে—এমন প্রত্যাশাই এখন হাওরপাড়ের মানুষের।

প্রতিবেদক : আহাদ হোসেন খান

Read Previous

নবগঠিত বিএনপি সরকারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেলেন আফরোজা খানম রিতা

Read Next

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বার্তা দিয়ে দায়িত্ব শুরু করলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular