১৯/০৪/২০২৬
৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: ভাঙা ভল্টে অস্ত্র উদ্ধার—নিরাপত্তা ঘাটতির চরম সংকেত

শাহা জালাল বিমানবন্দরের ভাঙা ভোল্ট

শাহা জালাল বিমানবন্দরের ভাঙ্গা ভোল্ট, ছবি: সংগৃহীত

পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি কার্গো হাউস যেন দিন দিন আরও অস্বস্তিকর এক রহস্যকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ড, ভল্ট ভাঙা, অস্ত্রগায়েব, আবার সেই ভাঙা ভল্ট থেকেই অস্ত্র উদ্ধার—ঘটনাগুলো এমনভাবে জড়াচ্ছে যে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে গুরুতর নিরাপত্তাজনিত প্রশ্ন। দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিমানবন্দরে এতগুলো ঘটনায় অভ্যন্তরীণ কোনো চক্র সক্রিয় কি না, সেই নিয়ে তদন্ত সংস্থাগুলোর ভেতরেও দেখা যাচ্ছে উদ্বেগ।

২০ দিন পর একই ভল্টে মিললো নিখোঁজ অস্ত্র

নতুন মোড় এসেছে গত বুধবার। জরুরি ইনভেন্টরি প্রক্রিয়ার সময় স্ট্রংরুমে লুকানো অবস্থায় তিনটি কার্টন পাওয়া যায়। সেখান থেকেই উদ্ধার হয়—

  • ১৬টি পিস্তল
  • ২৬টি পিস্তলের ম্যাগাজিন
  • ২০টি শটগান
  • ২০টি শটগানের ম্যাগাজিন
  • ২০টি প্লাস্টিক পাম্প অ্যাসেম্বলি
  • ৮০টি ব্যারেল ক্যাপ

অস্ত্রগুলো দ্রুত পুলিশের হেফাজতে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলো মূলত সেই ব্যারেট্টা মডেলের—যেগুলো ২০ দিন আগে নিখোঁজ বলে অভিযোগ উঠেছিল। প্রশ্ন দাঁড়ায়, যে ভল্ট সম্পর্কে শুরুতেই বলা হয়েছিল যে ভেঙে ফেলা হয়েছে ও সেখান থেকেই অস্ত্র হারিয়ে গেছে—সেই একই জায়গায় এত দিনের ব্যবধানে আবার অস্ত্র পাওয়া গেল কীভাবে?

একাধিক ঘটনার ধারা সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করছে

২৯ অক্টোবর বিমান কর্তৃপক্ষ যে জিডি করেছিল, সেখানে উল্লেখ ছিল—স্ট্রং ভল্টের তালা ভাঙা পাওয়া গেছে। পরে পুলিশ ওই ভল্ট থেকেই জব্দ করে:

  • ৬৭টি পিস্তল
  • ১২টি শটগান
  • ১টি অ্যাসল্ট রাইফেল
  • ১৩৮টি খালি ম্যাগাজিন
  • ৯৯১টি ব্ল্যাংক কার্টিজ

অন্যদিকে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এম/এস গানম্যাক্সের দাবি ছিল, মোট ৩৮টি অস্ত্র গায়েব। এখন মিলেছে ৩৬টি। বাকি দুটির কী হলো, সেগুলো কি এখনও কারও হাতে ঘুরছে, নাকি আরেকটি জায়গায় লুকানো আছে—তদন্তকারীরা এখন সেই দিকেও নজর দিচ্ছেন।

অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই শুরু নিরাপত্তাজনিত অস্থিরতা

১৮ অক্টোবর কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ আগুন লাগার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন, আগুনেই হয়তো অস্ত্রসহ মূল্যবান মালামাল পুড়ে গেছে। পরে দেখা গেল, আগুন ভল্ট পর্যন্ত পৌঁছায়নি। এর বদলে দেখা যায়—ভল্টে হাত দেওয়া হয়েছে, তালা ভাঙা, এবং অস্ত্র চুরির চিহ্ন স্পষ্ট।

প্রশ্ন ওঠে, এত সুরক্ষিত জায়গায় আগুন লাগার মতো ঘটনাও ঘটল, আবার সেই সুযোগে ভল্টও ভাঙা হলো—সবকিছু কি নিছক কাকতালীয়? নাকি কেউ পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো এবং চুরির দুটি ঘটনাকেই কাজে লাগিয়েছে?

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা দেয়ালও ভঙ্গুর

শুধু ভল্ট নয়, তদন্তে উঠে এসেছে আশপাশের দুর্বল অবস্থা। ভল্টের চারপাশের ১০০ মিটারের ভেতরে ছিল দেয়াল ভাঙা, কোথাও নেই কাটাতারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অগ্নিকাণ্ডের পরও এসব ঠিক হয়নি। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমন অবহেলা সত্যিই বিস্ময়কর।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্তের সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, ঘটনার প্রতিটি স্তরই সন্দেহ জন্মানোর মতো। তাদের ভাষায়, “অস্ত্র হারানো, এরপর আবার একই জায়গায় মিল পাওয়া—এটা স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। এ ধরনের কাজে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা ছাড়া আগানোই সম্ভব না।”

তবে তারা একই সঙ্গে বলেছেন, পূর্ণ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে যেতে রাজি নন। কারণ ঘটনাটি সংবেদনশীল; তাড়াহুড়ো করে কিছু বলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

২০ সদস্যের কমিটি, তিন দিনের সময়সীমা

কাস্টমস, পুলিশ, বিiman এবং অন্যান্য সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি ২০ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের দায়িত্ব—ঘটনার পুরো টাইমলাইন খুঁজে বের করা, কাদের দায়িত্বহীনতা বা জড়িত থাকার কারণে এই বিশৃঙ্খলা ঘটল, এবং অস্ত্রগুলো এত দিন কোথায় ছিল।

তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে, তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এত জটিল ঘটনার পূর্ণ চিত্র তিন দিনে উঠে আসা বেশ চ্যালেঞ্জিং।

দেশের প্রধান প্রবেশদ্বারে আস্থাহীনতা বাড়ছে

সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট: দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির নিরাপত্তা এখন গুরুতর প্রশ্নের মুখে। একটি অগ্নিকাণ্ড, একটি ভল্ট ভাঙা, অস্ত্র চুরি, আবার সেই ভল্ট থেকেই অস্ত্র উদ্ধারের মতো পরপর ঘটনা কোনোভাবেই সাধারণ ভুল বা অব্যবস্থাপনার মধ্যে ফেলা যায় না।

অভ্যন্তরীণ একটি চক্র সক্রিয় কি না, তদন্তই তার উত্তর দেবে। কিন্তু এরই মধ্যে পুরো প্রক্রিয়ার ওপর জনমনে আস্থা স্পষ্টভাবেই নড়বড়ে হয়ে গেছে।

প্রতিবেদক : নাদিয়া আক্তার

Read Previous

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে

Read Next

সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও মাসরুর আরেফিন ‘সিইও অব দ্য ইয়ার ২০২৫’ সম্মাননা পেলেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular