
দেউন্দি লাল শাপলা বিল
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা-বাগানের গভীরে যে লাল শাপলার বিলটি লুকিয়ে ছিল, সেটি এখন পুরো অঞ্চলের আলোচনার কেন্দ্র। আগে খুব কম মানুষই জায়গাটির নাম জানতেন, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকটি ছবি ভাইরাল হওয়ার পর সবকিছু বদলে গেছে। দিনের প্রথম আলো ফুটতেই বিলে জেগে ওঠে হাজারো লাল শাপলা, আর সেই দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন দূরদূরান্তের পর্যটকরা।
এ জায়গার পরিবেশটাও বিশেষ। চারদিকে চা-বাগান আর উঁচুনিচু টিলা, মাঝখানে বিশাল জলাভূমি। সেই জলভূমির ওপর শাপলার লাল রঙ যেন সবুজ পাহাড় আর চা-বাগানের ব্যাকড্রপে এক অনন্য দৃশ্য তৈরি করে। ভোরে দাঁড়িয়ে কেউ যদি চারদিকে তাকান, মনে হবে প্রকৃতি ঠিক নিজের মতো করে একটা রঙের উৎসব সাজিয়েছে।
ভোরেই বিলে সবচেয়ে বেশি শাপলা ফোটে। যারা একটু তাড়াতাড়ি বের হন, তারা পান এক অন্য রকম ছবি—বিলে সারি সারি শাপলা, তার ওপর ভেজা আলো, আর শান্ত চারপাশ। সেই দৃশ্য দেখেই অনেকেই ছবি তোলেন, আর সেখান থেকেই শুরু হয় ভাইরাল হওয়ার গল্প। ছবি দেখে কৌতূহল বাড়ে, আর একদিন ঠিক দল বেঁধে চলে আসে মানুষ।
স্থানীয়রা জানান, শাপলা সাধারণত রাতে ফুটতে শুরু করে, আর ভোরে সেগুলো পুরো প্রস্ফুটিত থাকে। দুপুরে রোদ বাড়লে ফুল কিছুটা ঢলে পড়ে, আবার বিকেলে ছড়ায় হালকা সৌরভ। ফলে সকাল ও বিকেল—এই দুই সময়েই বেশি ভিড় দেখা যায়। অনেকে আবার মাঝদুপুরেও চলে আসেন, যদিও তখন শাপলার রঙ কিছুটা ফিকে লাগে।
তবে বাড়তি ভিড়ের সঙ্গে কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কেউ কেউ বিলে নেমে শাপলা ছিঁড়ছেন, হাতে ধরে ছবি তুলছেন। এতে দ্রুত ক্ষতি হতে পারে বিলে থাকা শাপলার বিস্তার এবং পুরো বাস্তুসংস্থানের। স্থানীয়রা মনে করেন, এখনই যদি সচেতন করা না যায়, কয়েক বছরের মধ্যেই এই জায়গার সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে।
পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। বিলে ঘুরতে এলে চোখে পড়ে ভ্রাম্যমাণ দোকান। চা, বিস্কুট, পান—এমন নানা জিনিস নিয়ে বসে থাকেন বৃদ্ধ শফিক মিয়া। তিনি জানান, শাপলা ফুটার মৌসুমে তার দোকান ভালোই চলে। প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হয়। বছরে চার-পাঁচ মাস এই ব্যস্ততা তাকে টেনে নেয় সামনে।
শাপলা দেখতে আসা অনেকেরই অভিজ্ঞতা এক কথায় আনন্দের। রাব্বি আহমেদ নামে একজন বলছিলেন, ফেসবুকে ছবি দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। পরে বন্ধুদের নিয়ে চলে এসেছেন। জায়গাটা সরাসরি দেখে তাদের ভালো লাগাটা আরও বেড়েছে। ক্যামেরা, মোবাইল আর প্রকৃতির রঙ—সব মিলিয়ে মুহূর্তগুলো স্মরণীয় হয়ে থাকে।
এই নতুন ভ্রমণস্থলকে ঘিরে সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ ভাবছেন, যদি এলাকা একটু সাজানো-গোছানো হয়, তাহলে আরও বেশি পর্যটক আসবে। রাস্তা একটু উন্নত করা, বসার জায়গা তৈরি করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা—এসব করলে জায়গাটির মান বাড়বে। তবে যাই করা হোক, মূল সৌন্দর্য যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কারণ বিলে থাকা শাপলার এই প্রাকৃতিক বিস্তারটাই এখানে প্রধান আকর্ষণ।
প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে পর্যটন সুবিধা তৈরি করা কঠিন কিছু নয়, শুধু প্রয়োজন সবার দায়িত্বশীল আচরণ। বিলে নেমে ফুল ছেঁড়ার অভ্যাস বন্ধ করা, নির্দিষ্ট পথ ধরে চলা এবং জায়গাটা পরিষ্কার রাখা—এই কয়েকটা ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
দেউন্দি চা-বাগানের লাল শাপলা বিল আজ এমন এক জায়গা, যেখানে প্রকৃতি তার সৌন্দর্য দেখায় বিনা আয়োজনেই। এই সৌন্দর্যকে ধরে রাখতে হলে দর্শনার্থী থেকে স্থানীয় প্রশাসন—সবাইকে যত্নবান হতে হবে। কারণ প্রকৃতি একবার রুষ্ট হলে তাকে ঠিক আগের অবস্থায় ফেরানো আর সহজ হয় না।
এই মুহূর্তে বিলটি যেভাবে নতুন পর্যটন স্পটে পরিণত হচ্ছে, সেটি আনন্দের। আর এই আনন্দ যদি যত্নের সঙ্গে এগোয়, তাহলে লাল শাপলা বিলে ভোরের আলোয় ফুটে থাকা এই রঙিন ফুলগুলো বহু বছর ধরে মানুষের মন ভালো করে দেবে।
প্রতিবেদক : মুহাম্মাদ শফিকুল আশরাফ



