
ছবি : সংগৃহীত
পর্যটযন সংবাদ ডেস্ক : আইসল্যান্ড—অন্য গ্রহের মতো এক দেশ। আগ্নেয়গিরি, গিজার, লাভা-ফিল্ড, হিমবাহ, কালো বালির সৈকত কিংবা নর্দান লাইট—প্রতিটি দৃশ্য যেন সিনেমার দৃশ্য। কিন্তু এই দেশের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে হলে বাংলাদেশের নাগরিকদের সবার আগে যেটা প্রয়োজন, তা হলো শেঙ্গেন ভ্রমণ ভিসা। কারণ আইসল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না হলেও শেঙ্গেন অঞ্চলের অংশ। আর তাই একই নিয়মে বাংলাদেশ থেকে আইসল্যান্ড ভ্রমণের ভিসা নিতে হয়। সমস্যা হলো—আইসল্যান্ডের নিজস্ব কোনো দূতাবাস নেই বাংলাদেশের জন্য। এজন্য বাংলাদেশিদের এ ভিসার আবেদন করতে হয় ডেনমার্ক দূতাবাসের মাধ্যমে। যাদের ভিসা প্রসেসিং পরিচালনা করে VFS Global।
এই ভিসার ধরন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আবেদন ঠিকানা, ফি, সময়সীমা—সবকিছু একসাথে জানা জরুরি, কারণ ভুল বা অস্পষ্ট কাগজপত্রই সাধারণত ভিসা দেরি বা বাতিলের কারণ হয়। তাই এবার বিস্তারিত দেখা যাক পুরো প্রক্রিয়াটি।
আইসল্যান্ড ভিসা কোথায় আবেদন করতে হয়?
ঢাকায় আইসল্যান্ডের দূতাবাস নেই। বাংলাদেশের আবেদনকারীদের ভিসা মূল্যায়ন করে ডেনমার্ক দূতাবাস, এবং ভিসা আবেদন গ্রহণ করে VFS Global Denmark Visa Application Centre।
আইসল্যান্ড ভিসা ⇒ ডেনমার্ক VAC (VFS Global) ⇒ ডেনমার্ক দূতাবাস কর্তৃক সিদ্ধান্ত।
VFS Global (Denmark / Iceland Visa Centre) ঠিকানা
ডেল্টা লাইফ টাওয়ার, প্লট ৩৭, রোড ৯০, গুলশান–২, ঢাকা।
কাজের সময়—
রবি–বৃহস্পতিবার, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা (আবেদন জমা)
পাসপোর্ট সংগ্রহ সাধারণত বিকেলে বা কুরিয়ার সেবা ব্যবহার করা যায়।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া আবেদন জমা দেওয়া যায় না। অনলাইনে সময় বুক করতে হয় VFS প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে।
কোন ভিসা নিতে হয়?
আইসল্যান্ড ভ্রমণের জন্য লাগে Schengen Short-Stay Visa (Type C)।
এই ভিসা নিয়ে—
- আইসল্যান্ডে থাকতে পারবেন ৯০ দিন (১৮০ দিনের মধ্যে),
- এবং চাইলে শেঙ্গেন অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও যেতে পারবেন।
যদি আপনি শুধু ঘোরার উদ্দেশ্যে যেতে চান, যেমন নর্দান লাইট দেখা, গোল্ডেন সার্কেল ট্যুর, আগ্নেয়গিরি ভিজিট—তাহলে এই ভিসাই যথেষ্ট।
ভিসার জন্য কোন কোন ডকুমেন্ট প্রয়োজন?
আইসল্যান্ড ভিসার ডকুমেন্টস মোটামুটি যেকোনো শেঙ্গেন দেশের মতোই। তবে যেহেতু এটি ডেনমার্ক প্রতিনিধিত্ব করে, তাই তাদের নিয়ম অনুযায়ী নথিপত্র জমা দিতে হয়।
ভুল, পুরনো, অসম্পূর্ণ বা অসঙ্গত নথি থাকলে ভিসা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই প্রতিটি ডকুমেন্ট স্পষ্ট ও আপডেটেড হতে হবে।
অবশ্যই লাগবে এমন ডকুমেন্ট
- ভিসা আবেদন ফর্ম (অনলাইনে পূরণ করে প্রিন্ট)
- পাসপোর্ট –
- নূন্যতম ২টি খালি পাতা
- মেয়াদ থাকতে হবে ভ্রমণ শেষে অন্তত ৩ মাস
- পুরনো পাসপোর্ট (যদি থাকে)
- ২টি পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- সাদা ব্যাকগ্রাউন্ড
- ৩৫×৪৫ মিমি
- ফ্লাইট রিজার্ভেশন
- হোটেল বুকিং / থাকার ঠিকানা
- ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স
- ন্যূনতম কভারেজ ৩০,০০০ ইউরো
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট (শেষ ৬ মাস)
- ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট
চাকরিজীবীদের জন্য অতিরিক্ত কাগজপত্র
- চাকরির লেটার
- বেতন স্লিপ (শেষ ৬ মাস)
- ছুটির অনুমতিপত্র
- প্রতিষ্ঠানের ইমেইল ও কনট্যাক্ট ডিটেইলস
ব্যবসায়ীদের জন্য প্রয়োজন
- ট্রেড লাইসেন্স
- কোম্পানির ব্যাংক স্টেটমেন্ট
- আয়ের প্রমাণ
- ভ্যাট/টিন সার্টিফিকেট
ছাত্রদের জন্য
- স্টুডেন্ট আইডি
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির অনুমতি
- অভিভাবকের আর্থিক নথি
স্পন্সর থাকলে
- স্পন্সর লেটার
- স্পন্সরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট
- সম্পর্কের প্রমাণ (NID/পরিবার সনদ)
যদি কেউ আইসল্যান্ড থেকে আমন্ত্রণ পাঠায়
- Invitation Letter
- হোস্টের পাসপোর্ট/রেসিডেন্ট কার্ড
- বাসস্থানের প্রমাণ
অতিরিক্ত নথি (ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়)
- পূর্ববর্তী ট্রাভেল হিস্ট্রি
- পূর্বের শেঙ্গেন ভিসা
- ভ্রমণের বিস্তারিত দিন–তারিখভিত্তিক পরিকল্পনা
- কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা বা পরিবারিক সংযোগের প্রমাণ (যা দেখায় আপনি দেশে ফিরবেন)
ভিসা ফি কত? (বাংলায়)
আইসল্যান্ড ভিসার ফি মূলত ডেনমার্ক শেঙ্গেন ভিসার সমান।
ভিসা ফি (২০২৪–২৫ অনুযায়ী)
- প্রাপ্তবয়স্ক: ৯০ ইউরো (প্রায় ১০,০০০ টাকা)
- শিশু (৬–১২ বছর): ৪৫ ইউরো (প্রায় ৫,০০০ টাকা)
- শিশু (০–৬ বছর): কোনো ফি নেই
VFS সার্ভিস চার্জ
- প্রায় ২,০০০–২,২০০ টাকা
ঐচ্ছিক খরচ
- কুরিয়ার
- ছবি
- ফটোকপি
- SMS আপডেট
সব ফি আবেদনকেন্দ্রে নগদ টাকা বা নির্ধারিত ব্যাংক পেমেন্টের মাধ্যমে জমা দিতে হয়।
আবেদন প্রক্রিয়া কেমন? (সহজ ভাষায় ধাপে ধাপে)
অনেকেই শেঙ্গেন ভিসা নিয়ে ভয় পান। কিন্তু নিয়ম জানা থাকলে পুরো প্রক্রিয়াটা একদম সহজ।
প্রক্রিয়াটি এরকম—
১. অনলাইনে ভিসা ফর্ম পূরণ
ডেনমার্ক/শেঙ্গেন ফর্ম পূরণ করে প্রিন্ট নিতে হবে।
২. VFS-এ অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করা
অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া কেউ গ্রহণ করে না।
আপনাকে তারিখ–সময় নির্বাচন করতে হবে।
۳. ডকুমেন্ট প্রস্তুত করে VFS-এ জমা
নির্ধারিত দিনে—
- পাসপোর্ট
- আবেদন ফর্ম
- ছবি
- সব নথি
- ফি
সব জমা দিতে হবে।
৪. বায়োমেট্রিক দেওয়া
ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবি তোলা হয়।
আপনি আগে শেঙ্গেনে বায়োমেট্রিক দিলেও সাধারণত আবার দিতে হয়।
৫. VFS আবেদন পাঠায় ডেনমার্ক দূতাবাসে
ভিসা সিদ্ধান্ত দূতাবাস নেয়।
৬. প্রসেসিং টাইম
- সাধারণত ১৫ কার্যদিবস
- কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ৩০–৪৫ দিন পর্যন্ত যেতে পারে
- ভ্রমণের অন্তত ১–১.৫ মাস আগে আবেদন করা ভালো
৭. পাসপোর্ট সংগ্রহ
VFS থেকে সংগ্রহ করা যায়।
কেউ চাইলে কুরিয়ার ব্যবহার করতে পারেন।
কেন ভিসা রিফিউজ হয়?—জেনে রাখা জরুরি
আইসল্যান্ড ভিসার স্ট্যান্ডার্ড উচ্চ। ভুল বা অস্পষ্ট কাগজপত্র সহজেই রিফিউজের কারণ হয়।
সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো—
- ব্যাংকে পর্যাপ্ত ব্যালান্স না থাকা
- হঠাৎ বড় অঙ্ক জমা
- অস্পষ্ট ট্রাভেল প্ল্যান
- ডকুমেন্টে তথ্যভেদ
- চাকরি/ব্যবসার দুর্বল প্রমাণ
- ওয়েস্টার্ন দেশগুলোর ভ্রমণ ইতিহাস না থাকা
- পরিবার বা দেশে ফেরার শক্ত প্রমাণ না থাকা
তাই প্রতিটি নথি নিশ্চিত করে জমা দিতে হবে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
আইসল্যান্ড ভ্রমণের ভিসায় সাধারণত যেসব জিনিস গুরুত্ব পায়—
- আর্থিক স্থিতি (ব্যাংক স্টেটমেন্টে স্থিতিশীল লেনদেন)
- নিয়মিত চাকরি বা ব্যবসার প্রমাণ
- বাস্তবসম্মত ভ্রমণ পরিকল্পনা
- হোটেল বুকিং + ফ্লাইট রিজার্ভেশন
- পরিষ্কার ব্যাংক সলভেন্সি
- ট্রাভেল হিস্ট্রি (যদি থাকে)
এক কথায়—আপনি ভ্রমণ শেষে বাংলাদেশে ফিরবেন—এই প্রমাণ যত শক্তিশালী হবে, ভিসা তত সহজ হবে।
আইসল্যান্ড এমন একটি দেশ, যেটা দেখার পর মনে হয় জীবনে অন্তত একবার যাওয়া উচিত। নর্দান লাইট, আগ্নেয়গিরির দেশে লাভা-ট্রেইল, বরফের গুহা—সব মিলিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে অনন্য গন্তব্যগুলোর একটি এই দেশ। আর সেই স্বপ্নের দেশে পা রাখতে চাইলে শেঙ্গেন ভিসা প্রক্রিয়াটা বুঝে নেওয়া জরুরি।



