
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক আকাশপথে ভ্রমণ খরচ বহুদিন ধরেই যাত্রীদের জন্য মাথাব্যথা। প্রতিবেশী দেশের তুলনায় এখানে একই রুটের টিকিটের দাম দুই থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেশি পড়ছে। একদিকে বাড়তি ভাড়া, অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগী ও অগোছালো বাজার—এই পুরো পরিস্থিতি সরকারকে নতুন করে নীতিমালা তৈরির পথে ঠেলে দিয়েছে।
এখানে কথাটা পরিষ্কার: ভারত থেকে যে রুটে ৩০,০০০ থেকে ৩৫,০০০ টাকায় যাওয়া যায়, বাংলাদেশে ঠিক সেই একই টিকিটের দাম লাফিয়ে পৌঁছে যায় প্রায় এক লক্ষ টাকায়। বছরের পর বছর এই বৈষম্যের কারণে যাত্রীরা ক্ষোভ জানিয়ে আসছে। অনেকেই মনে করেন, টিকিটের কৃত্রিম সংকট বা মজুদদারির কারণে দাম আরও বেড়ে যায়, আর সেই চাপটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধেই গিয়ে পড়ে।
এই বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এগিয়ে এসেছে নতুন আইনি কাঠামো দিয়ে। ট্র্যাভেল এজেন্সি অধ্যাদেশ ২০২৫ নামে খসড়া নীতিতে ভ্রমণ খাতের দুটি পুরোনো আইনকে সংশোধন করে কঠোর শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুন খসড়ায় বাল্ক টিকিট কেনা, মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা এবং তা বেশি দামে বাজারে ছাড়াকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগে যেখানে শাস্তি ছিল সর্বোচ্চ ছয় মাস, এখন সেই মেয়াদ বাড়িয়ে তিন বছর পর্যন্ত করা হয়েছে।
এজেন্সিগুলোকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—টিকিট সরাসরি গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করতে হবে। মাঝখানে অতিরিক্ত স্তর তৈরি করে ব্যবসা ঘুরিয়ে নেওয়া বা দামে প্রভাব তৈরির যে সুযোগ এতদিন ছিল, তা কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এখানে একটা বড় প্রশ্ন মাথা তোলে: যারা বহু বছর ধরে B2B বা ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা মডেলে কাজ করে এসেছে, তাদের ভবিষ্যত কী?
দেশজুড়ে ট্রাভেল এজেন্সির সংখ্যা কয়েক হাজার। এর মধ্যে ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ এজেন্সি পুরোপুরি B2B নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল। বড় এজেন্সিগুলোই বিদেশি এয়ারলাইনের টিকিট সংগ্রহ করত, আর ছোট এজেন্সিগুলো সেগুলো খুচরা দামে বিক্রি করত। নতুন আইন কার্যকরের সঙ্গে সঙ্গে এই চেইনটাই ভেঙে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেকেরই হিসেব—যদি B2B নিষিদ্ধ হয়, তাহলে অসংখ্য ছোট এজেন্সি আয়-রোজগারের পথ হারাবে, বাজার থেকে সরে যেতে বাধ্য হবে।
শিল্পের অভিজ্ঞেরা বলছেন, সরকারের উদ্দেশ্য ভালো—জালিয়াতি ঠেকানো, কৃত্রিম সংকট দূর করা এবং বাজারকে পরিষ্কার রাখা। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে পদ্ধতি নিয়ে। তাদের মতে, সমস্যা যদি থাকে অন্য জায়গায়, তাহলে সেই জায়গাটিই আগে ঠিক করা দরকার। কারণ টিকিটের অস্বাভাবিক দামের মূল উৎস শুধু এজেন্সিগুলো নয়; তার বড় অংশ লুকিয়ে আছে বিদেশী এয়ারলাইনের ভাড়া নীতিমালায়।
এখানেই বাংলাদেশের দুর্বলতা চোখে পড়ে। দেশের বাজারে কার্যকর কোনো ভাড়া নীতিমালা নেই। বিদেশী বিমান সংস্থাগুলোকে এখানে ফ্লাইট চালানোর আগে কোনো টিকেট মূল্যসীমা জমা দিতে হয় না। এর ফলে তারা ইচ্ছেমতো ন্যূনতম ও সর্বোচ্চ মূল্য ঠিক করতে পারে। অন্যদিকে ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড—এই দেশগুলো আগেই নিয়ম করে রেখেছে, কোনো এয়ারলাইন ঘোষিত মূল্যসীমার বাইরে যেতে পারবে না। ফলে টিকিটের দামও নিয়ন্ত্রিত থাকে।
বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থা না থাকায় বাজারের নিয়ন্ত্রণ কার্যত বিমানের হাতেই চলে যায়। খসড়া আইন শুধু এজেন্সিগুলোকে কড়াকড়ির মধ্যে রাখছে, কিন্তু মূল যে জায়গায় দাম বাড়ে, সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। সেকারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই একতরফা নিয়ন্ত্রণ ছোট ব্যবসাকে অকারণে দুর্বল করে দেবে এবং শক্তিশালী গোষ্ঠীর জন্য অযৌক্তিক সুযোগ তৈরি করবে।
সরকারি পদক্ষেপ নেওয়ার পর থেকে ভাড়া কিছুটা কমলেও তা এখনো মানুষের স্বাভাবিক প্রত্যাশার জায়গায় পৌঁছায়নি। বাজারে দাম ওঠানামা করছে, যাত্রীরা এখনো বিভ্রান্ত, আর ব্যবসায়ীরা দ্বিধায় আছেন নতুন নিয়ম কবে কীভাবে কার্যকর হবে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য—এখানে কোন পক্ষই একা সমাধান আনতে পারবে না। বিমান সংস্থা, ভ্রমণ এজেন্সি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সবাইকে একসঙ্গে ঠিক করতে হবে কোন মডেলটা দেশের স্বার্থ রক্ষা করবে। কেউ যদি দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, তাহলে সংস্কার প্রক্রিয়া থেমে যাবে, আর ভোক্তার ওপরই আবার বাড়তি চাপ পড়বে।




One Comment
https://shorturl.fm/YIoUA