
সেন্টমাার্টন দ্বীপ, ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক। পর্যটন সংবাদ : বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনকে ঘিরে বহুদিন ধরেই উদ্বেগ। পর্যটন বাড়ছে, কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ছে চাপ—বর্জ্য, পরিবেশ ধ্বংস, অনিয়ন্ত্রিত স্থাপনা, আর ক্রমশ ক্ষয়ে যাওয়া নাজুক বাস্তুতন্ত্র। এত বছর ধরে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব থেকেই গিয়েছিল। এবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সেই শূন্যতাটা পূরণ করতে এগিয়ে এল। তারা সেন্ট মার্টিনের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া মাস্টার প্ল্যান প্রকাশ করেছে, যা জনসাধারণের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি চলছে।
খসড়াটি সোমবার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করা হয়েছে। মূল লক্ষ্য একটাই—দ্বীপের ভঙ্গুর প্রকৃতিকে রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনার জন্য পরিষ্কার দিকনির্দেশনা তৈরি করা। দেশব্যাপী পরিবেশবাদী, গবেষক, স্থানীয় প্রশাসন, এমনকি পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের একটি কাঠামোবদ্ধ পরিকল্পনার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই নতুন খসড়া নীতিটি এসেছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিকল্পনার প্রকৃত গুরুত্ব কোথায়? সেন্ট মার্টিনের অবস্থাটা এমন যে সামান্য ভুল ব্যবস্থাপনাই দ্বীপের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। প্রবাল এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি আমাদের সামুদ্রিক পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন পর্যটন, অসচেতন আচরণ, এবং বিশেষ করে প্লাস্টিক বর্জ্যের দৌরাত্ম্য পুরো দ্বীপকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। নতুন মাস্টার প্ল্যান তাই শুধু একটি নথি নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দ্বীপটিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা।
মন্ত্রণালয় বলছে, তারা সবার মতামত চাইছে। সরকারি দপ্তর, বিভিন্ন সংস্থা, পরিবেশবিদ, এমনকি সাধারণ মানুষ—যে কেউ তাদের মতামত পাঠাতে পারবেন। মতামত জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২০ ডিসেম্বর, আর প্রস্তাব পাঠানোর ঠিকানা env2@moefcc.gov.bd। এই উন্মুক্ত আহ্বান দেখায় যে কর্তৃপক্ষ সত্যিই ব্যাপক আলোচনা চাইছে, যাতে পরিকল্পনাটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হয়।
সেন্ট মার্টিনের পরিকল্পনার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খসড়াও প্রকাশিত হয়েছে—“প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বর্ধিত উৎপাদক দায়িত্ব (ইপিআর) নির্দেশিকা ২০২৫”। এখানে মূল চিন্তা হলো উৎপাদকদের নিজেদের তৈরি প্লাস্টিকের দায়িত্ব নিতে বাধ্য করা, যাতে দেশের প্লাস্টিক দূষণ কমানো যায়। এটি একই সময়সীমায় মতামত গ্রহণ করবে, এবং মতামত পাঠানোর ঠিকানা env3@moefcc.gov.bd।
দুটি খসড়াই আসলে একই সমস্যার দুই দিক—পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই উন্নয়ন। সেন্ট মার্টিন একটি পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া হিসেবে ঘোষিত), আর প্লাস্টিক দূষণ সম্পূর্ণ দেশের জন্যই একটি দীর্ঘস্থায়ী হুমকি। তাই দুটি নথি একসঙ্গে উন্মুক্ত হওয়া বোঝায় যে সরকার সামগ্রিকভাবে পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করতে চাইছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এসব প্রস্তাব নিয়ে জনসাধারণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত পরিকল্পনাকে আরও বাস্তবসম্মত করে তুলবে। সেন্ট মার্টিনকে বাঁচানোর কাজ এখন আর একা সরকারের নয়; সবাইকে অংশ নিতে হবে। আর এটাই খসড়া প্রকাশের মূল উদ্দেশ্য—সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং যৌথভাবে সমাধান তৈরি করা।
যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবসম্মতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশ তার একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিকে ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত রাখতে পারবে। আর যদি নতুন ইপিআর নীতি ঠিকমতো কাজ করে, তবে প্লাস্টিক সমস্যাও নতুন দিশা পাবে। এখন বলটা মূলত জনগণ ও অংশীদারদের কোর্টে—তাদের মতামতই নির্ধারণ করবে পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপ।
প্রতিবেদক : মুহাম্মদ শফিকুল আশরাফ



