
ছবি: সংগৃহীত
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক: সুন্দরবনের পাদদেশ ঘেঁষে বয়ে চলা নদীর তীরে দাঁড়ালে মনে হয়—নদী যেন এক প্রাকৃতিক হাট। চারদিকে ছড়িয়ে থাকে বন থেকে ভেসে আসা নানা গাছের ফল। গরান, গেওয়া, খলিশা, সুন্দরী, পশুর, বাইনসহ নানা প্রজাতির গাছের এই ফলগুলো সাধারণ চোখে অমূল্য মনে না হলেও প্রকৃতির চোখে এগুলো ভবিষ্যৎ বনভূমির বীজ।
তবে বাস্তবতা বলছে অন্য কথা। কয়রার কাটকাটা, মহেশ্বরীপুর, দক্ষিণ বেদকাশীসহ সুন্দরবনের কাছের নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোতে প্রতিদিনের দৃশ্য—নদীতে জোয়ারে ভেসে আসা ফল কুড়াতে ব্যস্ত নারী-পুরুষ ও শিশুর দল। ঝুড়ি ভরে সংগ্রহ করা এই ফল পরে রোদে শুকিয়ে চুলার জ্বালানিতে রূপ নেয়। কেউ কেউ আবার এগুলো বিক্রি করে সামান্য কিছু অর্থ আয় করেন।
সকালে কয়রার শাকবাড়িয়া নদীর তীরে দেখা মিলল এমনই এক দৃশ্যের। নদীর পানিতে নামা আরতি মণ্ডল ও তাঁর প্রতিবেশীরা ঝুড়ি ভরে ফল তুলছেন। রাস্তার ধারে রোদে শুকানো হচ্ছে লালচে-বাদামি ফলগুলো। এ যেন এক মৌসুমি সংগ্রহ উৎসব, তবে এর পেছনে লুকিয়ে আছে জীবিকার বাস্তবতা।
শাকবাড়িয়া নদীর তীরে বসে লক্ষ্মী রানী বললেন, ‘সব ফল জ্বালানি হয় না। কিছু শুকায় না, কিছু গরু-ছাগল খায়। তবে যা শুকানো যায়, তাই আমাদের চুলার ভরসা।’
কয়রার কপোতাক্ষ কলেজের শিক্ষক বিদেশ রঞ্জন মৃধার মতে, এই ভাসমান ফল যদি নদীতীরের চরে পড়ে থাকত, তবে তা থেকে নতুন বন গড়ে উঠত। “এই চারা থেকেই গরান-গেওয়ার সবুজ বেষ্টনী সৃষ্টি হতো। এতে নদীভাঙন রোধ হতো, এমনকি স্থানীয় পর্যটন সম্ভাবনাও বাড়ত,” বলেন তিনি।
এভাবেই বন রক্ষার সম্ভাবনা হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সুন্দরবন ও উপকূল সংরক্ষণ আন্দোলন’-এর সদস্যসচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, “চুলার জন্য কাঠ নেই, তাই মানুষ ভাসমান ফল জ্বালায়। কিন্তু এই বীজগুলোই যদি গাছ হয়ে উঠত, তাহলে তা শুধু পরিবেশ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও আশীর্বাদ হতো।”
পর্যটনের সম্ভাবনার দিকটিও এখানে অবহেলিত। নদীতীরবর্তী এসব নতুন চর যদি সবুজে ঢাকা পড়ত, সেখানে পাখির আগমন বাড়ত, গড়ে উঠত ইকো ট্যুরিজম। প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্য তৈরি হতো এক আকর্ষণীয় গন্তব্য।
তবে বাস্তবতা বলছে, বন রক্ষার চেয়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ এখন বেশি জরুরি। মঠবাড়ী গ্রামের হালিমা বেগম হেসে বলেন, “চরে গাছ হইলে ভালো হতো, নদীও ভাঙত না। কিন্তু কয়ডা দিন চুলা বন্ধ রাখব কন?”
বন বিভাগের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন জানান, “প্রতিটি ভাসমান ফল একটি বীজ, একটি সম্ভাব্য গাছ। কিন্তু মানুষ এসব দেখে শুধু জ্বালানি চিনে, বন নয়।”
পর্যটনবান্ধব পরিকল্পনা ও স্থানীয়দের সচেতন করাই হতে পারে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ। না হলে বন ও নদী দুটিই হারাবে তার ভবিষ্যৎ—আর পর্যটনের স্বপ্নও সীমাবদ্ধ থাকবে কল্পনায়।



