
ডেমো ছবি
পর্যটন সংবাদ ডেস্ক : বাংলাদেশের পর্যটন খাত একদিকে যেমন পৃথিবীর কাছে অনন্য সম্ভাবনার দেশ হিসেবে পরিচিত হতে পারত, অন্যদিকে তেমনি সরকারি অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, দখলদারিত্ব, নীতিগত বিশৃঙ্খলা আর পর্যটন অবকাঠামো বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে পর্যটন খাতে নানান মহাপরিকল্পনা, ঘোষণা, বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি আসলেও বাস্তবে সে উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ঘেঁটে দেখা যায়—বাংলাদেশ পর্যটনের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো ছিল দুর্নীতি, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধীরগতি, পরিবেশগত অবহেলা, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং ভূমিদখল-মাফিয়ার আধিপত্য।
ফলে সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সুন্দরবন—যে সব পর্যটন কেন্দ্রগুলো বছরে লাখো মানুষকে আকর্ষণ করতে পারত, সেসব জায়গা উন্নয়নের বদলে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের পর্যটন খাত কি সত্যিই এগোতে পারেনি? নাকি ইচ্ছাশক্তির অভাব, দুর্নীতির বেড়াজাল এবং জবাবদিহির সংকটই উন্নয়নকে আটকে রেখেছে?
চলুন বিষয়গুলো একে একে দেখা যাক।
কক্সবাজার: সম্ভাবনার সমুদ্র, বাস্তবে বিশৃঙ্খলার পাহাড়
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার—বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড। প্রতিবছর লাখো পর্যটক আসেন, হাজারো ব্যবসা চলে। অথচ এখানেই সবচেয়ে বেশি অনিয়ম জমা হয়েছে।
অবৈধ দখলের মহোৎসব
কক্সবাজারে সুগন্ধা পয়েন্ট এলাকায় সরকারের প্রায় দুই শত কোটি টাকার জমি উদ্ধার অভিযানের ঘটনা জাতীয় খবরে ব্যাপক আলোচনায় আসে। এত বিশাল সম্পদ দীর্ঘদিন যেভাবে দখলে ছিল, তার সরাসরি দায় পড়ে সরকারি নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার ওপর।
দশকের পর দশক ধরে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কটেজ, দোকান—সবকিছু নির্মাণ হয়েছে অনুমোদন ছাড়াই। বহু মিডিয়া রিপোর্ট বলছে:
- স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা বছরের পর বছর দখল বজায় রেখেছে
- পর্যটন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ঠিকঠাক মনিটরিং করেনি
- প্রশাসনিক পর্যায়ে অনুমতি-বাণিজ্য ছিল
- পরিবেশ নষ্ট করে কংক্রিটের জঙ্গল গড়ে উঠেছে
যদি এই দখল আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা যেত, কক্সবাজার আজ দক্ষিণ এশিয়ার সেরা মেরিন পর্যটন কেন্দ্র হতে পারত।
পর্যটন পার্কের অগ্রগতি ‘কাগজে-কলমে’ সীমাবদ্ধ
বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস অথরিটি (বেজা) বছর কয়েক আগে কক্সবাজারে বিশ্বমানের পর্যটন পার্ক গড়ার ঘোষণা দেয়। লক্ষ্য ছিল—
- উপকূলীয় ইকো-ট্যুরিজম
- রিসোর্ট কমপ্লেক্স
- মেরিন অ্যাডভেঞ্চার জোন
- আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ
কিন্তু দখল, মামলা, অনুমতি জটিলতা আর দুর্নীতির কারণে প্রকল্পগুলোর বড় অংশই কার্যত থেমে আছে। পর্যটন-অর্থনীতির এই সম্ভাবনা ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
সেন্ট মার্টিন: দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ আজ বিপদের দ্বারপ্রান্তে
সেন্ট মার্টিন—বাংলাদেশের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং সবচেয়ে সুন্দর দ্বীপ। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ঘোষণা এসেছে ‘মাস্টারপ্ল্যান’-এর। লক্ষ্য ছিল—
- প্রবাল সংরক্ষণ
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
- পর্যটক নিয়ন্ত্রণ
- পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সংবাদ প্রতিবেদনে যে সমস্যাগুলো বারবার উঠে আসে—
প্রথম সমস্যা: অতিরিক্ত পর্যটক
একদিনে সর্বোচ্চ দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার পর্যটক দ্বীপে প্রবেশ করতে পারে—এমন নীতি থাকলেও বাস্তবে এসেছে তিন থেকে চার গুণ বেশি। প্রবাল রক্ষায় গৃহীত নীতিগুলো আলোচনার টেবিলের বাইরে তেমন কার্যকর হয়নি। সরকারি নজরদারির অভাব প্রবাল ভাঙা, বর্জ্য ফেলা, অযত্নে দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করেছে।
দ্বিতীয় সমস্যা: জাল টিকিট, অনুমতি ব্যবসা
বছরের পর বছর বিভিন্ন রিপোর্টে এসেছে:
- নৌযানে যাত্রী সীমা মানা হয় না
- অনুমতি-বাণিজ্য চলে
- পরিবেশ রক্ষার নামে বাজেট নেয়া হলেও সঠিক ব্যবহার হয় না
যদি সঠিকভাবে নীতিমালা বাস্তবায়ন হতো, সেন্ট মার্টিন মালদ্বীপের মতো ইকো-ট্যুরিজমের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারত।
সুন্দরবন: ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য — তবুও পরিকল্পনার টানাপোড়েন
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং ইউনেসকো স্বীকৃত প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু এখানেও পর্যটন উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই।
অবকাঠামো না থাকায় পর্যটকদের ভোগান্তি
জাতীয় গণমাধ্যমে বারবার উঠে এসেছে:
- নিরাপদ জেটি নেই
- পর্যাপ্ত টয়লেট নেই
- মানসম্মত গাইড সিস্টেম নেই
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল
- জরুরি মেডিকেল সেবা নেই
যেখানে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ পর্যটক সুন্দরবনে আসে, সেখানে এই মৌলিক সুবিধাগুলো না থাকা দৃষ্টিকটু।
পরিবেশের ঝুঁকি
অনেক পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন:
- পর্যটন নৌকা বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ নেই
- বনাঞ্চলে শব্দ দূষণ বাড়ছে
- বাঘ, হরিণ, পাখিসহ বন্যপ্রাণীর জীবনচক্রে প্রভাব পড়ছে
যদি পরিবেশবান্ধব নীতি কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ হতো, সুন্দরবন দক্ষিণ এশিয়ার ইকো-ট্যুরিজম মডেল হতে পারত।
কুয়াকাটা: ‘সমুদ্রের সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত শহর’ কেন পিছিয়ে রইল
কুয়াকাটা নিয়ে বহু প্রতিশ্রুতি ছিল—
- দেশের দ্বিতীয় মেরিন সিটি
- আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন জোন
- বিচ সাফারি পার্ক
- আধুনিক রিসোর্ট এলাকা
কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়—
- অপরিকল্পিত হোটেল নির্মাণ
- সৈকত দখল
- সরকারি বাজেট ব্যয়ের অস্বচ্ছতা
- ঢাকাসহ বড় শহর থেকে সরাসরি যাতায়াতের দুরবস্থা
বাংলাদেশের পর্যটনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্যের সম্ভাবনাগুলো এমনভাবেই ক্ষয়ে গেছে।
পর্যটন নীতিতে সমন্বয়ের অভাব: সমস্যার মূল
বাংলাদেশে পর্যটন উন্নয়ন কয়েকটি সংস্থার মাধ্যমে চালিত হয়—
- বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন
- পর্যটন বোর্ড
- সিভিল এভিয়েশন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়
- বেজা
- পরিবেশ অধিদপ্তর
- জেলা প্রশাসন
একদিকে নীতি আছে, অন্যদিকে বাস্তবায়ন আলাদা। সাংবাদিকদের ভাষায়—
“একটি সংস্থা অনুমতি দিলে আরেকটি সংস্থা আপত্তি তোলে।”
ফলে প্রকল্প থেমে যায়, বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহ হয়, আর স্থানীয় দখলদাররা সুবিধা নেয়।
সংখ্যাগুলোই বলছে উন্নয়ন কোথায় আটকে গেছে
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ যদি সঠিক নীতি অনুসরণ করত, তাহলে পর্যটন থেকে বছরে অন্তত দশ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব হতো।
কিন্তু এখনো আয় দাঁড়িয়ে আছে মাত্র এক হাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার আশেপাশে।
এটা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়—
এটা লাখো মানুষের সম্ভাব্য কর্মসংস্থান হারানোর বিষয়।
দুর্নীতি: উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু
জাতীয় দৈনিকগুলোর তদন্তমূলক রিপোর্টে কয়েকটি বিষয় বারবার এসেছে—
১. অনুমতি পেতে ঘুষ দিতে হয়
হোটেল নির্মাণ, পরিবেশ ছাড়পত্র, পর্যটন নৌযান লাইসেন্স—প্রতিটি জায়গায় ‘অফ-দা-রেকর্ড খরচ’ ছিলই।
২. প্রকল্পে বাজেট বাড়ানো হয়েছে বারবার
কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, সুন্দরবনের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাজেট কয়েক দফা বাড়লেও কাজে তার প্রতিফলন নেই।
৩. হোটেল-রিসোর্ট বরাদ্দে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন—“দলীয় পরিচয় থাকলে অনুমতি সহজ, না থাকলে বছরের পর বছর ফাইল চলে না।”
তাহলে কেন উন্নয়ন এগোয়নি?
সংক্ষেপে কারণগুলো—
- দুর্নীতি
- রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের দখল
- পর্যটন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধীরগতি
- পরিবেশ আইন অমান্য
- স্থানীয় প্রশাসনের অসঙ্গতি
- বিনিয়োগকারীদের হয়রানি
- সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাব
এসব মিলেই পর্যটন খাতে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
সমাধান কী হতে পারে?
বাংলাদেশ পর্যটনে পিছিয়ে থাকলেও আবার ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব নয়। প্রয়োজন—
১. শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি
প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি প্রকাশ করতে হবে। অনুমতি-বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে।
২. পরিবেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবন, কুয়াকাটা—সব জায়গায় পরিবেশ-সক্ষমতা রিপোর্ট বাধ্যতামূলক হতে হবে।
৩. পর্যটন-বান্ধব অবকাঠামো
রেল, বাস, জেটি, পরিষ্কার সৈকত, নিরাপদ পথঘাট — এসব ছাড়া পর্যটন বিকশিত হয় না।
৪. কমিউনিটি ভিত্তিক পর্যটন
স্থানীয়দের কর্মসংস্থান বাড়লে তারা পর্যটন রক্ষা করতেও আগ্রহী হবে।
৫. আন্তর্জাতিক মানের প্রচারণা
ভারত, নেপাল, মালদ্বীপের মতো বাংলাদেশকেও ব্র্যান্ডিংয়ে জোর দিতে হবে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে পর্যটন খাতে যে উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল, তার অনেকটাই দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতায় থেমে গেছে—এ সত্য অস্বীকার করার মতো নয়।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে ভবিষ্যত অন্ধকার।
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে কম নয়।
যদি সৎ নেতৃত্ব, স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, এবং পরিবেশবান্ধব নীতি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়—
তাহলে পর্যটন বাংলাদেশকে যেকোনো সময়ই নতুন অর্থনৈতিক শক্তি উপহার দিতে পারে।



